শজারুর কাঁটাওয়ালা ডাইনোসর 

শজারুর কাঁটাওয়ালা ডাইনোসর 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

প্রায় ১২৫ মিলিয়ন বছর আগের এক ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কার প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীবিজ্ঞানে নতুন করে আলো ফেলেছে। চীনে গবেষকেরা এক কিশোর ইগুয়ানোডন্টিয়ান/বৃহৎ তৃণভোজী ডাইনোসরের নিপুণভাবে সংরক্ষিত জীবাশ্ম উদ্ধার করেছেন। এর ত্বক এতটাই অক্ষত যে পৃথক কোষগুলি পর্যন্ত দৃশ্যমান। এই যুগান্তকারী গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছে ফ্রান্সের সি এন আর এস–এর বিজ্ঞানীরা। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশান্স পত্রিকায়।

ইগুয়ানোডন্টিয়া গোষ্ঠীর ডাইনোসরদের নিয়ে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গবেষণা চলছে। এরা প্রধানত তৃণভোজী এবং এদের ঠোঁটের মতো মুখ ও শক্তিশালী পিছনের পা ছিল বিশেষ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সদ্য আবিষ্কৃত এই হাওলঙ ডঙ্গি প্রজাতি এই পরিচিত ধারায় এক অভিনব সংযোজন। নামটি রাখা হয়েছে প্রখ্যাত চীনা জীবাশ্মবিদ ডং ঝিমিং-এর সম্মানে।

এই জীবাশ্মটির বিশেষত্ব শুধু কঙ্কাল নয়, বরং ত্বকের অভূতপূর্ব সংরক্ষণ। উন্নত এক্স-রে স্ক্যানিং ও উচ্চ রেজোলিউশনের কোষকলা ঘটিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এর ত্বকের অতি সূক্ষ্ম অংশ পরীক্ষা করেন। দেখা যায়, প্রায় ১২৫ মিলিয়ন বছর পরও পৃথক ত্বককোষ অক্ষত রয়েছে। এটি জীবাশ্মবিদ্যায় একেবারেই বিরল ঘটনা। এই বিশদ বিশ্লেষণের ফলেই আবিষ্কৃত হয় ডাইনোসরের শরীরে থাকা অদ্ভুত এক ফাঁপা কাঁটার গঠন।

এই কাঁটাগুলি ত্বক থেকে তৈরি, অর্থাৎ হাড়ের অংশ নয়, বরং সরাসরি ত্বক থেকে উৎপন্ন। এবং এগুলি সম্পূর্ণ ফাঁপা। ডাইনোসরের ক্ষেত্রে এমন গঠন অদৃষ্টপূর্ব। দেখতে অনেকটা সজারুর কাঁটার মতো হওয়ায় গবেষকেরা ধারণা করছেন, এগুলি হয়তো আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহৃত হত। প্রারম্ভিক ক্রিটেসিয়াস যুগে ছোট আকারের মাংসাশী ডাইনোসরদের আক্রমণ থেকে বাঁচতেই হয়তো এই প্রতিরক্ষামূলক অভিযোজন গড়ে উঠেছিল।

তবে প্রতিরক্ষাই একমাত্র সম্ভাব্য কাজ নয়। গবেষকেরা আরও মনে করছেন, তাপ নিয়ন্ত্রণেও হয়তো এই ফাঁপা কাঁটার ভূমিকা ছিল। শরীরের পৃষ্ঠতল বাড়িয়ে তাপ নির্গমন বা সংরক্ষণে সহায়তা করা সম্ভব। এমনকি পরিবেশগত কম্পন বা নড়াচড়া অনুভব করার সংবেদনশীল অঙ্গ হিসেবেও এদের ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আবিষ্কৃত নমুনাটি একটি কিশোর ডাইনোসরের। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায়ও এই কাঁটাগুলি বজায় থাকত কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ভবিষ্যতে আরও জীবাশ্মের আবিষ্কারই এ প্রশ্নের উত্তর দেবে। এই আবিষ্কার শুধু নতুন একটি প্রজাতি যোগ করেনি, বরং দেখিয়েছে যে ডাইনোসরের ত্বক ও শরীরের আবরণ আমাদের ধারণার চেয়েও বহুবিচিত্র ও উদ্ভাবনী। ১২৫ মিলিয়ন বছর আগের এই প্রাণী আজ আবারও জানান দিল প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবী ছিল বিস্ময়ে ভরপুর। সেই প্রাগৈতিহাসিক জীবনের বিবর্তন নিয়েই গবেষণায় এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

 

সূত্র: Cellular-level preservation of cutaneous spikes in an Early Cretaceous iguanodontian dinosaur by Jiandong Huang, Wenhao Wu,et.al; published in Nature Ecology, 2026; 10 (2): 203 DOI: 10.1038/s41559-025-02960-9

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three + 3 =