টাইফয়েড: আবার সে এসেছে ফিরিয়া 

টাইফয়েড: আবার সে এসেছে ফিরিয়া 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ মার্চ, ২০২৬

হাজার বছরের বেশি সময় ধরে টাইফয়েড মানুষকে কাবু করে এসেছে। একসময় এটি ছিল শহর উজাড় করে দেওয়া জ্বর। নোংরা জল, ভাঙা নর্দমা আর অজ্ঞতার পরিমণ্ডলে এটি নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ত। আধুনিক স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ জল আর অ্যান্টিবায়োটিকের যুগে এসে অনেকেই ভেবেছিলেন, এই অধ্যায় এখানেই শেষ- টাইফয়েড এবার ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। জীবাণুটি চুপচাপ নিজের কৌশল বদলে ফেলেছে। টাইফয়েডের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার নাম সালমোনেলা এন্টারিকা সেরোভার টাইফি (সংক্ষেপে এস. টাইফি)। একসময় অ্যান্টিবায়োটিক ছিল এর মোক্ষম ওষুধ। কিন্তু গত তিন দশকে এই জীবাণু প্রায় প্রতিটি ব্যবহৃত ওষুধের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে তার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। যেন প্রতিবার আক্রমণের পর সে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসছে। ২০২২ সালের এক ব্যাপক গবেষণায় নেপাল, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের ৩,৪৮৯টি এস. টাইফি নমুনার জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফল উদ্বেগজনক। এইসব প্রভূত মাত্রায় ঔষধ-প্রতিরোধী (XDR) রূপ এখন দ্রুত ছড়াচ্ছে। এর মানে, একাধিক শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক একসঙ্গে ব্যর্থ। অ্যাম্পিসিলিন, ক্লোরামফেনিকল, ট্রাইমেথোপ্রিম/সালফামেথক্সাজোল এই সকল পুরোনো ভরসাগুলি আর কাজ করছে না। এমনকি নতুন প্রজন্মের ফ্লুরোকুইনোলোন ও তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিনও প্রতিরোধের মুখে। অর্থাৎ চিকিৎসার অস্ত্রভান্ডার দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এই মহাশত্রুর পাসপোর্ট লাগে না। ১৯৯০ সালের পর থেকে অন্তত ২০০টি আন্তর্জাতিক বিস্তারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া এর প্রধান কেন্দ্র হলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল, এমনকি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতেও এর উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। আজ বিমানে চেপে কয়েক ঘণ্টায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া যায়, জীবাণুও সেই সুবিধা নিচ্ছে। এ শিক্ষা কোভিড-ই আমাদের দিয়েছে। গবেষণাপত্রটি প্রকাশের সময় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়–এর সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জেসন অ্যান্ড্রুজ সতর্ক করে বলেছেন, “এত দ্রুত উচ্চমাত্রার প্রতিরোধী টাইফি ছড়িয়ে পড়া গভীর উদ্বেগের বিষয়”। ২০১৬ সালে পাকিস্তানে প্রথম XDR টাইফয়েড শনাক্ত হয়। মাত্র তিন বছরের মধ্যে সেটি দেশটির প্রধান জেনোটাইপে পরিণত হয়। জীবাণুর বিবর্তনের গতি কখনও কখনও মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে দ্রুত হয়। এখন পরিস্থিতি এমন যে কার্যকর ওষুধ প্রায় একটাই—আজিথ্রোমাইসিন। কিন্তু গবেষণা বলছে, এর বিরুদ্ধেও প্রতিরোধী পরিব্যক্তিটি ছড়াতে শুরু করেছে। যদি এই প্রতিরোধ XDR টাইফির সঙ্গে মিশে যায়, তবে চিকিৎসা প্রায় অচল হয়ে পড়বে। চিকিৎসা না পেলে টাইফয়েডে মৃত্যুহার ২০ শতাংশের বেশি হতে পারে। ২০২৪ সালে বিশ্বে ১ কোটি ৩০ লক্ষের বেশি সংক্রমণ নথিভুক্ত হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ইতিমধ্যেই বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ।

তা এইচআইভি/এইডস বা ম্যালেরিয়ার চেয়েও বেশি প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। টাইফয়েড সেই বৃহত্তর সংকটের অংশ। তাহলে সমাধান? শুধু নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, টিকাই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল হতে পারে। টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। ২০২১ সালের ভারতে এক গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, শহরে শিশুদের টিকা দিলে প্রায় ৩৬ শতাংশ সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। পাকিস্তান ইতিমধ্যেই রুটিন টিকাকরণে টাইফয়েড ভ্যাকসিন যুক্ত করেছে—বিশ্বে তারাই প্রথম। আরও কয়েকটি দেশ সেই পথে হাঁটছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চারটি টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিনকে প্রাক-যোগ্যতা দিয়েছে, যা বিভিন্ন দেশের শিশু টিকাকরণ কর্মসূচিতে যুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সংক্রমণ তো সীমান্ত মানে না। টাইফয়েড আজ আর “গরিব দেশের জ্বর”নয়। সময়ও কম। টিকাদান সম্প্রসারণ, বিশুদ্ধ জল ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, আর নতুন অ্যান্টিবায়োটিক গবেষণায় বিনিয়োগ—এই তিনটিই একসঙ্গে দরকার। নইলে ইতিহাস আবার নিজেকে পুনরাবৃত্ত করবে। আর সেই নতুন ইতিহাসে প্রতিরোধী টাইফয়েডই হবে প্রধান চরিত্র।

 

সূত্র: Science Alert; February 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × four =