অ্যান্টার্কটিকায় বৃষ্টি ! 

অ্যান্টার্কটিকায় বৃষ্টি ! 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ মার্চ, ২০২৬

অ্যান্টার্কটিকায় বৃষ্টি! একসময় এটা প্রায় অসম্ভবের মতন শোনাতো। সেখানে বিজ্ঞানীরা ক্ষেত্রে কাজ করতে গেলে ভিজে যাওয়ার ভয় নয়, বরং ঠান্ডা আর তীব্র আলো থেকে বাঁচার প্রস্তুতি নেন। যেমন ডুভে জ্যাকেট, স্নো ট্রাউজার, গগলস, সানস্ক্রিন। বিমান নামে কাঁকর-পাথরের রানওয়েতে। বরফ জমে থাকে না, কারণ বৃষ্টিপাত নেই বললেই চলে। শুকনো ঠান্ডা হাওয়ায় শতবর্ষী কাঠের কুঁড়েঘর পর্যন্ত অক্ষত থাকে। কিন্তু এবার গল্প বদলাচ্ছে। সবচেয়ে আগে বদলাচ্ছে অ্যান্টার্কটিকার উত্তরমুখী সরু পাহাড়ি অংশ—অ্যান্টার্কটিকার উত্তরাংশের উপদ্বীপ। এই উপদ্বীপ বহুদিন ধরেই ওই মহাদেশের উষ্ণতম অঞ্চল। এখন তা গরম হচ্ছে বাকি অ্যান্টার্কটিকার চেয়ে দ্রুততর গতিতে। এমনকি বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ার গড় গতির চেয়েও ঢের দ্রুত গতিতে। ফলে এটাই হয়ে উঠেছে ভবিষ্যতের সতর্কতা সংকেত। বিশেষ করে ভঙ্গুর পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহ-আবরণ–এর জন্য। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপটধরে বিশ্লেষণ করেছেন – উচ্চ, মাঝারি ও নিম্ন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ। তাতে দেখা যাচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়লে মোট বৃষ্টিপাত সামান্য বাড়বে, কিন্তু তার বড় অংশ আর তুষার হবে না, থেকে যাবে বৃষ্টি রূপেই। শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকা দিনের সংখ্যা যত বাড়বে, বৃষ্টি ততই অ্যান্টার্কটিকার চরিত্র বদলে দেবে।

চরম আবহাওয়া ইতিমধ্যেই কড়া নাড়ছে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাপপ্রবাহে উপদ্বীপের উত্তরে তাপমাত্রা উঠেছিল ১৮.৬° সেলসিয়াসে। অ্যান্টার্কটিকার ইতিহাসে যা প্রায় নজিরবিহীন। বরফচাঁইয়ের পৃষ্ঠ গলেছে রেকর্ড গতিতে। এরপর ২০২২ ও ২০২৩ সালে “অ্যাটমসফেরিক রিভার”- উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুর সরু পথ, শীতের মাঝামাঝি সময়ে বৃষ্টি আর শূন্যের ওপরে তাপমাত্রা এনে দিয়েছে। যে অঞ্চলে আগে বৃষ্টি দেখাই যেত না এখন সেখানে নিয়মিত বৃষ্টি হচ্ছে। সমস্যা হলো, তুষার, বৃষ্টি সহ্য করতে পারে না। বৃষ্টি মানে তাপ, গলন আর ধুয়ে যাওয়া। হিমবাহের ওপর জমে থাকা তুষারই তার খাদ্য। বৃষ্টি এসে সেই খাদ্য সরিয়ে দেয়। গলা জল হিমবাহের তলায় পৌঁছে একধরনের পিচ্ছিলকারকের কাজ করে। ফলে, ভিত্তি পিচ্ছিল হয়, হিমবাহ দ্রুত সরে যায়, সমুদ্রে বরফখণ্ড ভাঙার হার বাড়ে। ভাসমান বরফের তাকের ওপর বৃষ্টি আরও বিপজ্জনক। তুষার চেপে বসে, পৃষ্ঠে জল জমে ডোবা তৈরি হয়। সেই জলের প্রতিফলন চারপাশের সাদা বরফের চেয়ে কম, তাই দ্রুত গরম হয়। উষ্ণ জল নিচের দিকে বরফ গলিয়ে বরফের পাত-কে দুর্বল করে দেয়। এমন গলিত জলের ডোবাই ২০০০–এর লারসেন ভাসমান বরফস্তর-এর এ ও বি অংশ ধসিয়ে দিয়েছিল। সমুদ্রের বরফও রেহাই পায় না। বৃষ্টি তুষার-ঢাকনা কমায়, প্রতিফলন ক্ষমতা হ্রাস করে, গলনকে ত্বরান্বিত করে। সমুদ্রবরফ কমলে ঢেউয়ের প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে যায়, হিমবাহের প্রান্ত সহজে ভেঙে পড়ে। পাশাপাশি শৈবাল ও কুচো চিংড়ির আবাস কমে, পেঙ্গুইন আর সিল মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ছোট হয়। এক্ষেত্রে পেঙ্গুইনেরা বিশেষ বিপদে রয়েছে। তারা বিবর্তিত হয়েছে এক মেরু মরুভূমিতে। বৃষ্টি তাদের জগতের অংশ ছিল না। ছানাদের তুলতুলে পালক জলরোধী নয়। ভারী বৃষ্টিতে তারা ভিজে হাইপোথার্মিয়ায় মারা যেতে পারে। উষ্ণ সমুদ্র, কম সমুদ্রবরফ, কম ক্রিল সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে। বরফনির্ভর অ্যাডেলি ও চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের জায়গায় দক্ষিণে বাড়তে থাকা জেন্টু পেঙ্গুইন দখল করতে পারে। ক্ষুদ্র স্তরে পরিবর্তন আরও গভীর। তুষার সরে গেলে “স্নো অ্যালগি”- মাইক্রোস্কোপিক উদ্ভিদ ব্যাহত হয়। এরা মাইক্রোব ও ক্ষুদ্র অমেরুদণ্ডীদের খাদ্য, আবার তুষারকে গাঢ় করে সূর্যালোক শোষণ বাড়িয়ে গলন ত্বরান্বিত করে। সাধারণত তুষার মাটিকে ইনসুলেট করে, তাপমাত্রার ওঠানামা থেকে নীচের প্রাণীদের রক্ষা করে। বৃষ্টি সেই সুরক্ষাই সরিয়ে দিচ্ছে। উষ্ণ সমুদ্র আক্রমণাত্মক প্রজাতির জন্য দরজা খুলে দিচ্ছে। কিছু ঝিনুক বা কাঁকড়া নতুন করে বসতি গড়ছে। আর মানুষ? তারাও চ্যালেঞ্জের বাইরে নয়। ভূ-রাজনৈতিক আগ্রহ বাড়ছে। পর্যটন বা ক্রিল মাছ ধরার মতো শিল্পের জন্য অবকাঠামোও বাড়তে পারে। কিন্তু গবেষণা স্টেশনগুলো বানানো হয়েছিল তুষারের জন্য, টানা বৃষ্টির জন্য নয়। রানওয়েতে বৃষ্টি জমে বরফ হলে বিমান ওঠানামা বন্ধ হতে পারে। কাদা, গলিত জল ভবন, যন্ত্রপাতি, যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত করে। কোথাও কোথাও গবেষণা সাইট সরাতেও হতে পারে। উপদ্বীপে ৯০ এর বেশি ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে, যা দুই শতাব্দীর অভিযানের সাক্ষ্য। উষ্ণ ও ভেজা আবহাওয়ায় পারমাফ্রস্ট গলে ভিত্তি বসে যেতে পারে, কাঠ দ্রুত পচতে পারে। সংরক্ষণ হবে আরও কঠিন। অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ ইতিমধ্যেই দ্রুত রূপান্তরের ভেতর। যদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ২°সে বা ৩°সে–এর দিকে যায়, চরম আবহাওয়া, বৃষ্টি ও পৃষ্ঠগলন তীব্রতর হবে। বাস্তুতন্ত্র, হিমবাহ, অবকাঠামো ও ঐতিহ্যের ক্ষতি হতে পারে গভীর ও অপরিবর্তনীয়।

১.৫°C–এর নীচে উষ্ণায়ন সীমিত করা গেলেও সব পরিবর্তন থামবে না। কিন্তু গতি ধীর হতে পারে। এককালে বিরল বৃষ্টি এখন অ্যান্টার্কটিকার হিমশীতল পরিচয়কেই বদলে দেওয়ার শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। বরফের মহাদেশে জল পড়ছে—আর সেই জলই ইতিহাস লিখছে নতুন করে।

 

সূত্র: The Conversation; February 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + 2 =