হাতের গঠন দেখে হরমোন অসাম্য নির্ণয়

হাতের গঠন দেখে হরমোন অসাম্য নির্ণয়

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৯ মার্চ, ২০২৬

সম্প্রতি জাপানের কোবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হরমোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তাঁদের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কেবল হাতের ছবি বিশ্লেষণ করেই একটি হরমোনজনিত রোগ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো—এটি মুখের ছবি ব্যবহার করে না, ফলে রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত পত্রিকা “The Journal of Clinical Endocrinology & Metabolism”–এ (২৭ শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। যে রোগটি শনাক্ত করা হয়েছে, তার নাম অ্যাক্রোমেগালি। এটি হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে ঘটা একটি বিরল রোগ,যা সাধারণত মধ্যবয়সে শুরু হয়। অতিরিক্ত বাড়বৃদ্ধির হরমোন উৎপাদনের কারণে হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে যায়, মুখমণ্ডলে পরিবর্তন দেখা দেয় এবং হাড় ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। প্রথম কথা রোগটি খুবই বিরল আর এর গতিপ্রকৃতিও এতটাই ধীর যে অনেক সময় সঠিক রোগনির্ণয়ে প্রায় এক দশক লেগে যায়। চিকিৎসা না হলে এটি হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল থেকে জটিলতর রোগভোগের সৃষ্টি করতে পারে, গড় আয়ু প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।

গবেষকরা ইচ্ছাকৃতভাবেই মুখের ছবি এড়িয়ে হাতের তালুর বিপরীত অংশ ও মুঠো করা হাতের ছবি বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ অ্যাক্রোমেগালির লক্ষণ হিসেবে দৃশ্যমান পরিবর্তন হাতেই স্পষ্টভাবে দেখা যায়। তাছাড়াও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে তাঁরা হাতের তালুর ছবি ব্যবহার করেননি, যাতে স্বতন্ত্র হস্তরেখাচিত্রের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত না হয়। তাঁদের এই গোপনীয়তা বজায় রাখার কৌশল রোগীদের আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়। জাপানের ১৫টি চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে ৭২৫ জন রোগী ১১,০০০–এর বেশি ছবি সরবরাহ করেন, যা দিয়ে এ আই মডেলটিকে প্রশিক্ষিত ও যাচাই করা হয়। ভিন্ন ভিন্ন ক্যামেরা ও আলোকপরিবেশে সংগৃহীত তথ্য মডেলটিকে বাস্তব জীবনের বৈচিত্র্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম করেছে।

ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এই এ আই মডেলটি উচ্চ সংবেদনশীলতা ও নির্দিষ্টতার সঙ্গে অ্যাক্রোমেগালি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। একই ছবির ভিত্তিতে তুলনামূলক পরীক্ষায় এটি অভিজ্ঞ হরমোন বিশেষজ্ঞের চেয়েও ভালো ফল দেখিয়েছে। গবেষকদের মতে, মুখের বৈশিষ্ট্য ছাড়াই এত উচ্চমানের নির্ভুলতা অর্জন ভবিষ্যতের রোগ-স্ক্রিনিং ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে পারে।

তবে এই প্রযুক্তি চিকিৎসকদের বিকল্প নয়, সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, ল্যাব পরীক্ষার ফল ও অন্যান্য ক্লিনিক্যাল তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এই কৃবু ব্যবস্থাকে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, রক্তাল্পতা বা আঙুলের ক্লাবিং প্রভৃতি হাতের দৃশ্যমান পরিবর্তন-সম্পর্কিত অন্যান্য রোগ শনাক্ত করার কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষকদের বিশ্বাস, এ ধরনের প্রযুক্তি আঞ্চলিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশেষজ্ঞের অভাব পূরণে সহায়ক হবে এবং স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

সূত্র : “Automatic Acromegaly Detection Using Deep Learning on Hand Images: A Multicenter Observational Study” 27 February 2026,published in “The Journal of Clinical Endocrinology & Metabolism”.

DOI: 10.1210/clinem/dgag027

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − 1 =