ভারতের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের নতুন পর্যায় 

ভারতের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের নতুন পর্যায় 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৯ মার্চ, ২০২৬

বন্যপ্রাণ জীববিজ্ঞানী কামার কুরেশি ২০২৬ সালের অনিল আগরওয়াল বক্তৃতা সভায় ভারতের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে বাঘ সংরক্ষণে দেশ যে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক অর্জন। ২০০০-এর দশকের শুরুতে যেখানে বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় ১,৪০০, আজ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৩,৬৮২-এ। এই উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে শক্তিশালী “সোর্স পপুলেশন” অর্থাৎ বড়ো বড়ো সমৃদ্ধ সংরক্ষিত অঞ্চল, যেখানে পর্যাপ্ত শিকারের প্রাণী ও নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র বাঘকে টিকিয়ে রেখেছে। জিম করবেট জাতীয় উদ্যান , কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যান , পশ্চিমঘাট এবং মধ্য ভারতের কিছু অঞ্চল এ ধরনের উৎসকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।

কিন্তু সাফল্যের এই শিখরে পৌঁছেও সতর্কবার্তা দিতে হচ্ছে। কুরেশি বলেন, বাঘ সংরক্ষণের সাফল্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে শিকারের প্রাপ্যতার ওপর। একটি বাঘ টিকে থাকতে বছরে গড়ে প্রায় ৩৪৯টি খুরওয়ালা প্রাণী (যেমন- চিতল, সাম্বর, গৌর) প্রয়োজন। অনেক সংরক্ষিত অরণ্য ইতিমধ্যেই তাদের ধারণক্ষমতার সীমায় পৌঁছে গেছে। শিকারের জন্য প্রাণীর ঘাটতি হলে কিন্তু বাঘ টিকবে না। তাই শুধু সংখ্যা বাড়ানোই সমাধান নয়; আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, তৃণভূমি সংস্কার, আগ্রাসী উদ্ভিদ অপসারণ ও জলব্যবস্থার উন্নয়ন প্রভৃতি দীর্ঘমেয়াদি কাজ অপরিহার্য। আগাছা অপসারণ, তৃণভূমি পুনরুদ্ধার, জলব্যবস্থাপনা ও শিকারের প্রাণী বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ নিতে এক দশকেরও বেশি সময় লাগে। যেমনটা মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যানে দেখা গেছে।

তবে এক্ষেত্রে সংযোগপথ রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাঘ স্বভাবতই শত শত কিলোমিটার দূর-দূরান্তে বিচরণ করে, নতুন এলাকা খোঁজে যাতে অন্তঃ-প্রজনন না হয়। এটাই তাদের জিনবৈচিত্র্য রক্ষার শর্ত। কিন্তু সড়ক, রেললাইন, খনি ও অবকাঠামো প্রকল্প সংযোগপথগুলোকে খণ্ডিত করছে। ফলে সংরক্ষিত অরণ্যগুলো ক্রমশ ‘বাস্তুতান্ত্রিক দ্বীপে’ পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্য ভারতে, যেখানে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বেশি।

একই চিত্র দেখা যায় হাতির ক্ষেত্রেও। ভারতে প্রায় ২২,৪৪৬টি হাতি রয়েছে, যার বেশিরভাগই পশ্চিমঘাটে। তবু ফসলহানি, সম্পত্তি ক্ষতি ও মানবমৃত্যুর ঘটনা সামাজিক সহনশীলতার সীমা নির্দেশ করছে। আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়ায় তাদের চলাচলের পথ বদলে গেছে এবং মানুষের সঙ্গে সংঘর্ষ বেড়েছে।

নদীর প্রাণীকুলও মুক্ত নয়, তারাও রীতিমতো চাপে রয়েছে। গাঙ্গেয় ডলফিনের সংখ্যা প্রায় ৬,৩২৭ হলেও অতিরিক্ত জল উত্তোলন, বাঁধ নির্মাণ ও নৌপরিবহন তাদের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত করছে। তৃণভূমির প্রতীক গ্রেট ইন্ডিয়ান বাস্টার্ড এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। এদের সংখ্যা এখন মাত্র ১০০-১৫০; বিদ্যুৎ লাইনের সঙ্গে সংঘর্ষ এদের জন্য এক বড় হুমকি।

সব মিলিয়ে কুরেশির বক্তব্য হল সংরক্ষিত অরণ্যভিত্তিক নীতি আর যথেষ্ট নয়। এখন প্রয়োজন ভূখণ্ড ব্যাপী পরিচালন ব্যবস্থা। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদভূমি ব্যবহার এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য সরকারস্থানীয় সম্প্রদায় ও অংশীজনদের যৌথ অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই এক ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া চালু করা চাই। এর দ্বারা পরিবেশগত ন্যায়বিচার ও দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও শাসন কাঠামোকে বোঝায়। সেখানে আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, সংযোগপথের সুরক্ষা ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত বিবেচনা একসঙ্গে যুক্ত হবে। নইলে আজকের সাফল্য ভবিষ্যতের সংকটে পরিণত হতে পারে।

 

সূত্র: India’s conservation success has reached ecological, social limits: Qamar Qureshi at AAD 2026 by Preetha Banerjee Assistant editor, Down To Earth, Published on: 25 Feb 2026, 6:42 pm. https://www.cseindia.org/page/aaddialogue2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − 10 =