গ্যালিলিওর হাতে-লেখা নোট
একদিকে অন্ধকার মধ্যযুগ, অন্যদিকে হঠাৎ আলোর বিস্ফোরণ। সেই আলোর কেন্দ্রে এক নাম, গ্যালিলিও গ্যালিলাই। যেন টেলিস্কোপ হাতে তিনি আকাশের দিকে তাকালেন, আর ভেঙে দিলেন সহস্রাব্দের বিশ্বাস। কিন্তু সাম্প্রতিক এক আবিষ্কার, এই পরিচিত গল্পটাকে আরও জটিল, আরও মানবিক করে তুলেছে।
ইতালির ‘ফ্লোরেন্স ন্যাশনাল সেন্ট্রাল লাইব্রেরী’-তে সংরক্ষিত ১৬ শতকের একটি জ্যোতির্বিদ্যার গ্রন্থ। বহুদিন ধরেই এটি গবেষকদের নজরে ছিল। সম্প্রতি এক ইতিহাসবিদ তারই পুরোনো পৃষ্ঠার এক প্রান্তে খেয়াল করেন ক্ষীণ, প্রায় মুছে যাওয়া কিছু হাতের লেখা। সূক্ষ্ম তুলনা, কালি-পরীক্ষা, হস্তাক্ষর বিশ্লেষণ, সব মিলিয়ে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেছে, তা চমকপ্রদ। নোটগুলো গ্যালিলিওর নিজের লেখা। গ্রন্থটি আর কিছু নয়, প্রাচীন গ্রিক জ্যোতির্বিদ ক্লডিয়াস টলেমির-এর বিখ্যাত কাজ ‘আলমাজেস্ট’। দ্বিতীয় শতকে রচিত এই বই প্রায় ১৪০০ বছর ধরে পাশ্চাত্য জ্যোতির্বিদ্যার ভিত্তি এটি। এর মূল বক্তব্য, পৃথিবী স্থির, সূর্য ও গ্রহরা তাকে কেন্দ্র করে ঘোরে। এই ভূকেন্দ্রিক মডেল শুধু বৈজ্ঞানিক দিক থেকে ভূল ছিল না, ধর্মীয় ও দার্শনিক কাঠামোর সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। গ্যালিলিওকে আমরা চিনি এই ভূকেন্দ্রিক ধারণার প্রবল সমালোচক হিসেবে। ১৬১০ সালে প্রকাশিত তাঁর বই সিডেরিউস নানসিয়াস -এ তিনি টেলিস্কোপ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে চাঁদের পাহাড়, বৃহস্পতির উপগ্রহ এসব দেখিয়ে মহাবিশ্বের পুরোনো ছবিতে ফাটল ধরান। পরবর্তীতে সূর্যকেন্দ্রিক ধারণার সমর্থনে তিনি প্রবল বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।
কিন্তু নতুন আবিষ্কৃত নোটগুলো অন্য গল্প বলছে। সেগুলোর সম্ভাব্য তারিখ ১৫৯০ দশকের। অর্থাৎ টেলিস্কোপ যুগের আগের সময়। তখন গ্যালিলিও তরুণ অধ্যাপক। তখনও প্রকাশ্যে ভূকেন্দ্রিক মতের বিরোধিতা শুরু করেননি। অথচ তাঁর নোটে দেখা যাচ্ছে, তিনি টোলেমির জ্যামিতিক মডেল মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করছেন। কোথাও হিসাব টানছেন, কোথাও ব্যাখ্যা পরিষ্কার করছেন, কোথাও আবার সূক্ষ্ম প্রশ্ন তুলছেন। এই নোটগুলোই প্রমাণ করে, গ্যালিলিও বিপ্লব শুরু করেছিলেন শূন্য থেকে নয়। তিনি আগে প্রাচীন তত্ত্বকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন। টোলেমির জটিল উপবৃত্ত, উপচক্র, গণিত সবকিছু বুঝে নিয়েই তার সীমাবদ্ধতা ধরতে পেরেছিলেন। বিজ্ঞান এখানে বিদ্রোহ নয় বরং শৃঙ্খলাবদ্ধ সমালোচনা। এর আরও একটি আকর্ষণীয় দিক রয়েছে। বইটির এক প্রান্তে বাইবেলের একটি গীতসংহিতার অংশ নকল করা আছে। এতে বোঝা যায়, গ্যালিলিওর বৌদ্ধিক জীবন ধর্মীয় পাঠ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল না। পরবর্তী সময়ে যেভাবে তাঁকে “বিজ্ঞান বনাম চার্চ” দ্বন্দ্বের প্রতীক বানানো হয়েছে, এই নোটগুলো সেই সরলীকৃত ছবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই আবিষ্কার আমাদের বিজ্ঞান বিপ্লবের ধারণাকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। আমরা প্রায়ই মনে করি, নতুন বিজ্ঞান মানেই পুরোনোকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা। কিন্তু গ্যালিলিওর প্রান্তলিখন দেখাচ্ছে, নতুন ধারণা গড়ে ওঠে পুরোনোর ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে, তাকে খুঁটিয়ে পড়ে, বিশ্লেষণ করে, কখনও সংশোধন করে। এই প্রান্তলিখনগুলো কেবল কালি-দাগ নয়। এগুলো এক তরুণ চিন্তকের মানসিক পরীক্ষাগার। এখানে আমরা দেখতে পাই প্রশ্নের জন্ম, সন্দেহের অঙ্কুর, যুক্তির শাণিত হওয়া। টেলিস্কোপ হাতে আকাশ দেখার আগে তিনি বইয়ের পাতায় মহাবিশ্বকে মাপছিলেন। আধুনিক গবেষণায় হস্তাক্ষর বিশ্লেষণ, কাগজের উপাদান পরীক্ষা এবং সমসাময়িক নথির সঙ্গে তুলনা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে নোটগুলো সত্যিই গ্যালিলিওর। ফলে এটি কেবল সাহিত্যিক কৌতূহল নয়, বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা ঐতিহাসিক তথ্য। আরে বিজ্ঞান ইতিহাসে বড় আবিষ্কার মানেই সবসময় নতুন গ্রহ বা নতুন কণা নয়। কখনও কখনও একটি পুরোনো বইয়ের প্রান্তে লুকিয়ে থাকা কয়েকটি বাক্য আমাদের শেখায়, জ্ঞানের বিপ্লব আসলে ধারাবাহিকতার মধ্যেই জন্ম নেয়। গ্যালিলিওর এই নোট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যের পথে হাঁটতে হলে আগে বিরোধী মতটিকেও মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। বিজ্ঞান, শেষ পর্যন্ত, তর্কের শিল্প। আর সেই শিল্পের অনুশীলন শুরু হয় প্রশ্ন দিয়ে। প্রান্তে লেখা ছোট ছোট প্রশ্ন, যেগুলো একদিন মহাবিশ্বের ভাবনার কেন্দ্র বদলে দিতে পারে।
সূত্র: Science, February, 2026
