অন্ধজনে দেহো আলো 

অন্ধজনে দেহো আলো 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ মার্চ, ২০২৬

সম্প্রতি পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন গবেষক সহ ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটিয়েছেন। তাঁরা একটি ক্ষুদ্র তারবিহীন রেটিনাল প্রতিস্থাপক যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষত সেইসব লোকের যারা বার্ধক্যজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (এ এম ডি) নামের চোখের রোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অন্ধত্বে ভুগছিলেন। আন্তর্জাতিক এক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক রোগী আবার আংশিকভাবে কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন। কেউ কেউ দীর্ঘদিন পর আবার অক্ষর বা শব্দ পড়তে সক্ষম হয়েছেন। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম শীর্ষ জার্নাল দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন-এ।

এ এম ডি মূলত বয়স্ক মানুষের মধ্যে দেখা যায়। এটি রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে রোগীরা ধীরে ধীরে তাদের কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। বিশেষ করে এর একটি গুরুতর রূপ, জিওগ্রাফিক অ্যাট্রোফি (জি এ), স্থায়ী অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। আজ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ লক্ষেরও বেশি মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত।

এই নতুন প্রযুক্তির মূল উপাদান হলো মাত্র ২×২ মিলিমিটার আকারের একটি রেটিনাল চিপ। এই কৃত্রিম প্রতিস্থাপক যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে যাওয়া চোখের আলোক সংবেদী কোষগুলোর কাজ আংশিকভাবে প্রতিস্থাপন করে। বিশেষ চশমায় লাগানো একটি ক্ষুদ্র ক্যামেরা আশপাশের দৃশ্য ধারণ করে এবং নিকটবর্তী অবলোহিত রশ্মি ব্যবহার করে সেই তথ্য ইমপ্লান্টে পাঠায়। এরপর ইমপ্লান্ট সেই আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে রেটিনার অবশিষ্ট স্নায়ুকোষকে উদ্দীপিত করে, ফলে মস্তিষ্ক আবার দৃশ্যের তথ্য গ্রহণ করতে পারে।

এই আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ইউরোপের পাঁচটি দেশে ১৭টি চিকিৎসা কেন্দ্রে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মোট ৩৮ জন রোগী অংশ নেন। এক বছরের পর্যবেক্ষণ শেষে দেখা যায়, ৩২ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২৬ জন (প্রায় ৮১%) উল্লেখযোগ্য দৃষ্টিশক্তির উন্নতি অনুভব করেছেন। অনেকেই চোখের চার্টে গড়ে ২৫টি অক্ষর বেশি পড়তে সক্ষম হন, যা প্রায় পাঁচ লাইনের সমান উন্নতি। এমনকি কিছু রোগী বহু বছর পর আবার বইয়ের লাইন ও শব্দ পড়তেও সক্ষম হন।

গবেষকদের মতে, এই প্রথম এতজন রোগীর ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় আশানুরূপ সফলতা পাওয়া গেছে। যদিও এই প্রযুক্তি এখনও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক দৃষ্টি (২০/২০ ভিশন) ফিরিয়ে দিতে পারে না, তবুও এটি অন্ধত্বের সীমা অতিক্রম করে রোগীদের দৈনন্দিন জীবনে দৃষ্টির স্বাধীনতা এনে দিতে পারে।

গবেষণার ইতিবাচক ফলাফলের ভিত্তিতে এই ডিভাইস নির্মাতা সায়েন্স কর্পরেশন ইতিমধ্যে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাগত অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি হলে এই প্রযুক্তি লক্ষ লক্ষ অন্ধ মানুষের জীবনে নতুন আলো এনে দিতে পারে।

 

সূত্র: Subretinal Photovoltaic Implant to Restore Vision in Geographic Atrophy Due to AMD by Frank G. Holz, Yannick Le Mer,et.al; published in New England Journal of Medicine, 2026; 394 (3): 232 DOI: 10.1056/NEJMoa2501396

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × two =