নিয়ান্ডারথাল বাবা, হোমো স্যাপিয়েন্স মা

নিয়ান্ডারথাল বাবা, হোমো স্যাপিয়েন্স মা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১২ মার্চ, ২০২৬

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা মানব বিবর্তনের ইতিহাসে লুকিয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেছে। তিনজন প্রাচীন নারী হোমো নিয়ান্ডারথালেন্স-এর জিন উপাদান বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, আধুনিক মানুষ/ হোমো স্যাপিয়েন্স ও নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে আন্তঃপ্রজননের ধরন ছিল একপেশে। অর্থাৎ নারী হোমো স্যাপিয়েন্স ও পুরুষ নিয়ান্ডারথালের মিলন তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটেছে, পুরুষ হোমো স্যাপিয়েন্স ও নারী নিয়ান্ডারথালের যুগল ছিল কম।

গবেষণার সহলেখক, আলেকজান্ডার প্ল্যাট, যিনি পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জিনতত্ত্ববিদ। তিনি মনে করেন এই ফলাফল প্রমাণ করে যে বিবর্তন কেবল জিনের অন্ধ পরিবর্তনের কাহিনি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের আচরণ, পছন্দ ও সামাজিক বাস্তবতা। তাঁর মতে, বিজ্ঞানীরা প্রাচীন জিনোম বিশ্লেষণকে একটা গড়পড়তা পরিসংখ্যান হিসেবে দেখেছে। কিন্তু এ ছিল রক্ত-মাংসের মানুষের গল্প। বাস্তবে যাদের নিজস্ব পছন্দ ও সামাজিক প্রবণতা ছিল।

বর্তমান মানুষের জিনোমে সর্বোচ্চ প্রায় ৪% পর্যন্ত নিয়ান্ডারথালের ডিএনএ থাকতে পারে। তবে এই জিনগত উপাদান সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। বিশেষ করে এক্স-ক্রোমোজোমের অধিকাংশ অংশে নিয়ান্ডারথাল পূর্বপুরুষের চিহ্ন অনুপস্থিত। এই অঞ্চলগুলোকে বলা হয় ‘নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ ডেজার্ট’। এতদিন এ নিয়ে দুটি প্রধান তত্ত্ব ছিল। প্রথমত, নিয়ান্ডারথাল জিনের কিছু রকমফের আধুনিক মানুষের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় সেগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বাদ পড়েছে। দ্বিতীয় তত্ত্ব বলছে, কিছু জিন এক প্রজাতির জন্য উপযোগী হলেও অন্য প্রজাতির জন্য নয়—ফলে পারস্পরিক সংমিশ্রণে সেগুলো টেকেনি। তবে, বিষয়টা এতটাও সহজ-সরল ছিল না।

এই গবেষণা গল্পের উল্টো দিকটি খতিয়ে দেখেছে,মানব ডিএনএ কীভাবে নিয়ান্ডারথালদের জিনোমে সংহত হয়েছিল। যথাক্রমে ১,২২,০০০, ৮০,০০০ ও ৫২,০০০ বছর আগে বসবাসকারী তিন নারী নিয়ান্ডারথালের জিনোম বিশ্লেষণে দেখা যায়—তাঁদের এক্স-ক্রোমোজোমে গড়ে ৬২% বেশি মানব ডিএনএ রয়েছে, অন্যান্য ক্রোমোজোমের তুলনায় । আশ্চর্যের বিষয়, এই অতিরিক্ত ডিএনএ অধিকাংশই নন-কোডিং অঞ্চলে, যা সরাসরি কোনো জৈবিক সুবিধা দেয় না। অর্থাৎ, এই বণ্টন কেবল প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফল নয়; বরং প্রাগৈতিহাসিক যুগের লিঙ্গভিত্তিক মিলন-প্রবণতা ও সামাজিক কাঠামোও এর পেছনে কাজ করেছে।

সব মিলিয়ে, এই গবেষণা মানব বিবর্তনের ইতিহাসকে আরও মানবিক করে তোলে। মানব বিবর্তন কেবল প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নয়। এটি মানুষের আচরণ, আকর্ষণ ও সামাজিক সিদ্ধান্তের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

 

সূত্র: Neanderthal dad, human mum: study reveals ancient procreation pattern by Freda Kreier, published in Nature journal,26th February2026.

doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-00583-z

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 3 =