মহাবিশ্বের মৌলিক গঠন বোঝার ক্ষেত্রে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যগুলোর একটি হলো হিগস বোসন কণার আবিষ্কার। দশকের পর দশক তাত্ত্বিক গবেষণা এবং অত্যন্ত জটিল পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অবশেষে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাটি আবিষ্কার করতে পেরেছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা নিশ্চিত করতে পেরেছেন যে মহাবিশ্ব জুড়ে একটি অদৃশ্য হিগস ক্ষেত্র বিদ্যমান, যার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই পদার্থের ভর সৃষ্টি হয়। এটি আধুনিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের প্রধান তাত্ত্বিক কাঠামো “হিগস স্ট্যান্ডার্ড মডেল’’-এর একটি অপরিহার্য অংশ। এই মডেলটি মূলত ব্যাখ্যা করে মহাবিশ্বের মৌলিক কণাগুলো কীভাবে গঠিত এবং তারা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে বিভিন্ন মৌলিক বলের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া করে।
দীর্ঘদিন ধরেই পদার্থবিদরা গণিতভিত্তিক তত্ত্ব ব্যবহার করে কণাদের আচরণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে আসছিলেন। কিন্তু সেখানে একটি বড় সমস্যা থেকে যাচ্ছিল। মানে, সেইসব তত্ত্ব অনুযায়ী কণাগুলোর ভরহীন হওয়ার কথা । অথচ বাস্তব পরীক্ষায় দেখা যায় ইলেকট্রন, কোয়ার্কসহ অনেক মৌলিক কণারই ভর রয়েছে। এই বিশাল বৈপরীত্যের সমাধান খুঁজতেই জন্ম নেয় হিগস বোসন কণার ধারণা। প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানে ভরকে সাধারণভাবে কোনো বস্তুর মধ্যে থাকা পদার্থের পরিমাণ বা গতির পরিবর্তনের প্রতি তার প্রতিরোধ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম কণা পদার্থবিজ্ঞানে ভরের উৎস ব্যাখ্যা করতে হয় কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের মাধ্যমে। যখন বিজ্ঞানীরা ক্ষীণ পারমাণবিক বল ব্যাখ্যা করার জন্য গণিতের সমীকরণ ব্যবহার করেন, তখন দেখা যায় এই সমীকরণগুলো ঠিকমতো কাজ করে কেবল তখনই, যখন বলবাহী কণাগুলোকে ভরহীন ধরা হয়। কিন্তু হাতে কলমে পরীক্ষা করলে দেখা যায় এই বলবাহী কণাগুলো যথা- W boson ও Z boson—আসলে বেশ ভারী।
এই সমস্যা ছিল আরও গুরুতর। যদি কণাগুলোকে ভর দেওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা না যায়, তাহলে পুরো স্ট্যান্ডার্ড মডেল তত্ত্বটাই ভেঙে পড়বে। তাই বিজ্ঞানীরা এমন একটি প্রক্রিয়ার সন্ধান করতে থাকেন যা কণাকে ভর দিতে পারে, আবার একই সাথে তত্ত্বের গাণিতিক সামঞ্জস্যও বজায় রাখে।
পরবর্তীকালে এই জটিল সমস্যার সমাধান হিসেবে বিজ্ঞানীরা একটি সর্বব্যাপী কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের ধারণা প্রস্তাব করেন, যাকে বলা হয় হিগস ফিল্ড। পদার্থবিজ্ঞানে এই ফিল্ড/ক্ষেত্র বলতে বোঝায় এমন কিছু যা মহাকাশের প্রতিটি বিন্দুতে উপস্থিত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, বৈদ্যুতিক বা চৌম্বক ক্ষেত্র সর্বত্র ছড়িয়ে থাকে এবং চার্জযুক্ত কণাগুলিকে প্রভাবিত করে। ঠিক তেমনভাবেই ধারণা করা হয় যে হিগস ক্ষেত্র পুরো মহাবিশ্ব জুড়ে বিস্তৃত। অর্থাৎ মহাশূন্যের প্রতিটি স্থানে এই ক্ষেত্র উপস্থিত। তবে হিগস ক্ষেত্রের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রের মান শূন্য হতে পারে, কিন্তু হিগস ক্ষেত্রের মান এমনকি শূন্যস্থানেও শূন্য নয়। অর্থাৎ মহাশূন্য নিজেই যেন এই ক্ষেত্র দ্বারা পূর্ণ। যখন মৌলিক কণাগুলো এই ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে চলাচল করে, তখন তারা এর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। এই মিথস্ক্রিয়ার শক্তির উপর নির্ভর করে কণাটি কতটা ভর অর্জন করবে। যেসব কণা হিগস ক্ষেত্রের সাথে জোরালো মিথস্ক্রিয়া করে, তারা বেশি ভর পায়। যেসব কণা কম মিথস্ক্রিয়া করে, তারা তুলনামূলকভাবে হালকা থাকে। আর কিছু কণা, যেমন ফোটন, এই ক্ষেত্রের সঙ্গে কোনো মিথস্ক্রিয়া করে না, তাই তাদের ভর নেই। হিগস ক্ষেত্রের সঙ্গে কণার মিথস্ক্রিয়ার এই বিশেষ প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় হিগস প্রক্রিয়া বা মেকানিজিম। ধারণা করা হয়, মহাবিশ্বের জন্মের পরপরই—অর্থাৎ মহা বিস্ফোরণের ঠিক পরের প্রথম মুহূর্তগুলোতে—হিগস ক্ষেত্রের মান ছিল শূন্য। তখন সব মৌলিক কণাই ছিল ভরহীন এবং আলোর গতিতে চলমান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্ব ঠান্ডা হতে শুরু করলে হিগস ক্ষেত্রের মধ্যে ঘটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যাকে বলা হয় স্বতঃস্ফূর্ত সুষমা ভঙ্গ বা “spontaneous symmetry breaking”। এর ফলে ক্ষেত্রটি শূন্য অবস্থায় না থেকে একটি স্থায়ী অশূন্য মানে স্থির হয়ে যায়। এই পরিবর্তনের পর থেকেই কণাগুলো হিগস ক্ষেত্রের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে ভর অর্জন করতে শুরু করে। ফলে মহাবিশ্বে ধীরে ধীরে ভরযুক্ত কণার সৃষ্টি হয়।
এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একই সঙ্গে দুটি বিষয় নিশ্চিত করে—
1. পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণগুলোর গাণিতিক সামঞ্জস্য বজায় রাখা।
এবং 2. বাস্তব জগতে ভরযুক্ত কণার অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করা ।
এবার জানা যাক হিগস বোসন কণাটি কী? কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিটি ক্ষেত্রের একটি সংশ্লিষ্ট কণা থাকে – হিগস ক্ষেত্রের সেই কণাই হলো হিগস বোসন কণা। যাকে আমরা কণা ভাবছি বা বলছি সেটি আসলে হিগস ক্ষেত্রের একটি ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম কম্পন বা উত্তেজনা। অর্থাৎ ক্ষেত্রের ভেতরে সামান্য এক ধরনের তরঙ্গ সৃষ্টি হলে সেটিকেই আমরা হিগস বোসন কণা হিসেবে দেখি। এই হিগস বোসনের কয়েকটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন, এটি একটি স্কেলার কণা, কারণ এর স্পিন শূন্য এবং এর কোনো দিকনির্ভর কৌণিক ভরবেগও থাকে না। অধিকাংশ মৌলিক কণার স্পিন থাকে, কিন্তু এখানেই অন্যান্য মৌলিক কনার থেকে হিগস বোসন কণা সম্পূর্ণ আলাদা। এটি অত্যন্ত অস্থির এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অন্য কণায় ভেঙে যায়। এই কণার অস্তিত্ব প্রমাণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ সেটি প্রমাণ করলেই বোঝা যাবে যে হিগস ক্ষেত্র বাস্তবেই রয়েছে কিনা।
১৯৬৪ সালে প্রথিতযশা পদার্থবিদ পিটার হিগস ও ফ্রাঁসোয়া এঙলারট সহ কয়েকজন বিজ্ঞানী এই কণার অস্তিত্বের পূর্বাভাস দেন। তাঁরা গণিতের মাধ্যমে দেখান যে যদি হিগস ক্ষেত্র সত্যিই কণাগুলিকে ভর দেয়, তাহলে অবশ্যই একটি নতুন কণার অস্তিত্ব থাকা উচিত—আর সেটাই হলো হিগস বোসন।
তত্ত্বটি অত্যন্ত সুন্দর এবং শক্তিশালী হলেও সেটিকে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। কারণ হিগস বোসন তৈরি করতে প্রয়োজন ছিল অত্যন্ত উচ্চ শক্তির কণা সংঘর্ষ, যা তখনকার প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব ছিল না। তাই এই তত্ত্বকে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে বিজ্ঞানীদের কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হল।
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সত্যই এল। ২০১২ সালে ইউরোপের গবেষণা সংস্থা CERN-এর বিশাল কণা ত্বরক Large Hadron Collider-এ পরিচালিত পরীক্ষায় হিগস বোসনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেল । এই যন্ত্রে প্রোটন কণাগুলোকে প্রায় আলোর গতিতে ত্বরান্বিত করা হয় এবং একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটানো হয়। এই সংঘর্ষে উৎপন্ন বিশাল শক্তি অনেকটা বিগ ব্যাং-এর ঠিক পরের প্রাথমিক অবস্থার মতো।
সে বছরই জুলাই মাসে ATLAS ও CMS পরীক্ষায় প্রায় ১২৫ GeV ভরের একটি নতুন কণার সন্ধান মেলে, যা হিগস বোসনের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায়। এই আবিষ্কারকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
হিগস বোসনের আবিষ্কার নিঃসন্দেহে আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম বড় সাফল্য। শুধুমাত্র একটি নতুন কণার আবিষ্কার হিসেবেই এর গুরুত্বকে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। কারণ এটি নিশ্চিত করেছে—হিগস ক্ষেত্রে অস্তিত্বশীল কণাগুলো যে ভর পায় তার ব্যাখ্যা সঠিক। যদি হিগস ক্ষেত্র না থাকত, তাহলে মৌলিক কণাগুলোর কোনো ভর থাকত না। ফলে ইলেকট্রন আলোর গতিতে ছুটে বেড়াত এবং পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারপাশে স্থিতিশীল কক্ষপথ তৈরি করতে পারত না। এর মানে— পরমাণু তৈরি হত না, অণু তৈরি হত না, পদার্থের কোনো গঠনই তৈরি হত না অর্থাৎ আমাদের চারপাশের মহাবিশ্বের হয়তো কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্বই থাকত না।
যদিও হিগস বোসনের আবিষ্কার স্ট্যান্ডার্ড মডেলকে প্রায় সম্পূর্ণ করেছে, তবু পদার্থবিজ্ঞানের অনেক বড় প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। উদাহরণস্বরূপ—এটি ডার্ক ম্যাটার কী তা ব্যাখ্যা করতে পারে না,এটি মাধ্যাকর্ষণ বলকে অন্তর্ভুক্ত করে না, মহাবিশ্বের গভীরতর তত্ত্ব এখনও অজানা । এছাড়াও কিছু নতুন তত্ত্ব এমন ইঙ্গিত দেয় যে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বাইরেও আরও ভিন্ন ধরনের হিগস কণা থাকতে পারে।
হিগস বোসনের আবিষ্কার একদিকে যেমন একটি যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক সাফল্য, তেমনই অন্যদিকে ভবিষ্যতের নতুন গবেষণা ও অনুসন্ধানের পথও উন্মুক্ত করেছে। হিগস বোসনের এই আবিষ্কারকে ঘিরেই হয়তো ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের আরও গভীর রহস্য উন্মোচিত হবে।
