কোয়ান্টাম সম্ভাব্যতা নীতির নতুন প্রমাণ 

কোয়ান্টাম সম্ভাব্যতা নীতির নতুন প্রমাণ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ মার্চ, ২০২৬

মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম বুঝতে গিয়ে বরাবরই এমন কিছু পরীক্ষা করা হয়ে থাকে যেগুলো বিজ্ঞানের এক ধারণাকে আরেক ধারণায় বদলে দিয়েছে। তেমনই একটি বিখ্যাত পরীক্ষা হলো ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট। এই ডাবল স্লিট হল একটি পাতলা পর্দা ওপর দুটি খুব সরু সমান্তরাল ফাঁক, যার মধ্য দিয়ে আলো বা কণা (যেমন ইলেকট্রন) পাঠিয়ে তাদের তরঙ্গধর্মী আচরণ পরীক্ষা করা হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলোজি-র পদার্থবিদরা এই পরীক্ষাটির সবচেয়ে নিখুঁত ও সূক্ষ্ম সংস্করণটি সম্পন্ন করেছেন। আর সেই ফলাফল আবারও দেখিয়েছে যে কোয়ান্টাম জগৎ আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। যা অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের ধারণার সঙ্গেও পুরোপুরি মেলে না।

ডাবল স্লিট পরীক্ষায় সাধারণত ইলেকট্রন বা ফোটনের মতো অতি ক্ষুদ্র কণাকে দুটি খুব সরু ফাঁক বা স্লিটের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখন এই কণাগুলো একটি পর্দায় আঘাত করে, তখন তারা আলাদা আলাদা দাগ তৈরি করার বদলে ঢেউয়ের মতো একটি ইন্টারফিয়ারেন্স প্যাটার্ন/ব্যাতিচার বিন্যাস তৈরি করে। এমনকি কণাগুলোকে যদি একেকবারে একটি করে পাঠানো হয়, তবুও একই ধরনের ঢেউখেলানো নকশা দেখা যায়। এর অর্থ, পরিমাপ বা পর্যবেক্ষণের আগে কণাগুলো কেবলই কণার মতো আচরণ করে না, বরং তারা তরঙ্গের বৈশিষ্ট্যও প্রদর্শন করে।

এই ধারণাটি আইনস্টাইনের খুব একটা মনঃপূত ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃতি মূলত সুশৃঙ্খল এবং পূর্বানুমেয় নিয়মে পরিচালিত হয়। তাই তিনি ধারণা করেছিলেন, কোয়ান্টাম তত্ত্বের এই অদ্ভুত আচরণের পেছনে হয়তো কোনো লুকানো নিয়ম বা “হিডেন ভ্যারিয়েবল” কাজ করছে। সেটা বিজ্ঞানীরা এখনো আবিষ্কার করে উঠতে পারেননি।

এই প্রশ্নের আরও নির্ভুল উত্তর খুঁজতেই এম আই টি-এর গবেষকেরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন পরীক্ষা চালান। তারা অত্যন্ত স্থিতিশীল লেজার, উচ্চ সংবেদনশীল ডিটেক্টর এবং সূক্ষ্ম পরিমাপ পদ্ধতি ব্যবহার করে ইন্টারফিয়ারেন্স প্যাটার্নের সামান্য থেকে সামান্যতর পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করেন। এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল কোয়ান্টাম আচরণের পেছনে সত্যিই কোনো গোপন সংকেত বা অজানা নিয়ম রয়েছে কি না তা খুঁজে বের করা।

ফলাফল হিসেবে দেখা গেছে সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেও কণাগুলো ঠিক সেইভাবেই আচরণ করেছে, যেমনটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ভবিষ্যদ্বাণী করে। কোনো গোপন সংকেত বা লুকানো নিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, কোয়ান্টাম জগতের অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনাভিত্তিক আচরণ প্রকৃতিরই মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এটা কেবল আমাদের পরিমাপের সীমাবদ্ধতা নয়।

গবেষকদের মতে, এই পরীক্ষাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি আগের অনেক পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা দূর করেছে। প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে এখন বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম জগতকে আরও সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। প্রতিটি নতুন পরীক্ষা আগের ফলাফলকে আরও শক্তিশালী করছে এবং দেখাচ্ছে যে কোয়ান্টাম বলবিদ্যাই প্রকৃতিকে সবচেয়ে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করে।

তবে এই ঘটনা ব্যাখ্যায় আইনস্টাইন সাময়িকভাবে ভুল প্রমাণিত হলেও তাঁর অবদান কিন্তু কোনোভাবেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর তীব্র সন্দেহ ও প্রশ্নই বিজ্ঞানীদের কোয়ান্টাম তত্ত্বকে আরও কঠোরভাবে পরীক্ষা করতে অনুপ্রাণিত করেছে। সেই দীর্ঘ গবেষণার ফলেই আজ আমরা লেজার প্রযুক্তি, আধুনিক কম্পিউটার এবং উন্নত ইলেকট্রনিক্সের মতো অসংখ্য প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছি।

এম আই টি-এর এই নতুন গবেষণাটির ফলাফল আরও একবার দেখিয়ে দিল দিল বিজ্ঞানে অগ্রগতি ঘটে প্রশ্ন, বিতর্ক এবং নতুন নতুন প্রমাণের মধ্য দিয়েই। আর কখনো কখনো, সবচেয়ে বড় অগ্রগতির পথ তৈরি করে দেন সেই বিজ্ঞানীরাই, যারা প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন চিহ্নের মুখে রেখেছিলেন।

 

সূত্র: #trendora #fblifestyle #quantum #science #physics

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 + fifteen =