ইউরোপে লৌহযুগে গণহত্যা 

ইউরোপে লৌহযুগে গণহত্যা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ মার্চ, ২০২৬

সার্বিয়ার উত্তরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান গোমোলাভা-তে একটি গণ কবর আবিষ্কৃত হয়েছে। তা ইউরোপে লৌহ যুগের এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরেছে। প্রায় ২,৮০০ বছর আগে এখানে অন্তত ৭৭ জন মানুষকে পরিকল্পনামাফিক নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।

 

গবেষণায় দেখা গেছে, মৃতদের শরীরে ভোঁতা অস্ত্রের আঘাত এবং ছুরির আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যা প্রমাণ করে তারা সহিংস হামলায় নিহত হয়েছিল। এই ঘটনার পেছনে সম্ভবত একটি সংগঠিত আক্রমণ বা পরিকল্পিত নিধন যজ্ঞ ছিল। গবেষকদের মতে, এটি ইউরোপের প্রাগৈতিহাসিক যুগের অন্যতম বড় গণহত্যার নিদর্শন।

সাধারণত প্রাচীন গণ কবরে একই গ্রামের পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ডিএনএ বিশ্লেষণ একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কবরের অধিকাংশ মানুষ পরস্পরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় নয়—এমনকি তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও সরাসরি সম্পর্কের প্রমাণ নেই। অর্থাৎ তারা সম্ভবত ভিন্ন ভিন্ন বসতি বা সম্প্রদায় থেকে আসা মানুষ।

গবেষণায় আরও জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে ১ থেকে ১২ বছর বয়সী ৪০টি শিশু, ১১ জন কিশোর এবং ২৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক। তাদের মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশই নারী। আশ্চর্যের বিষয়, কবরটিতে পাওয়া একমাত্র শিশু-পুত্র ছিল একটি পুরুষ নবজাতক। এই অস্বাভাবিক লিঙ্গ অনুপাত থেকে গবেষকরা এই ধারণা করছেন যে আক্রমণকারীরা সচেতনভাবেই নারী ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল।

প্রাচীনকালে হামলার সময় শিশু ও তরুণদের প্রায়ই বন্দি করে দাস হিসেবে নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাদের হত্যা করা হয়েছিল, যা সম্ভবত ভয় প্রদর্শন বা ক্ষমতার বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল।

কবর দেওয়ার পদ্ধতিটিও ছিল অস্বাভাবিক। মৃতদেহগুলো একটি পরিত্যক্ত আধা-ভূগর্ভস্থ ঘরের মধ্যে সমাহিত করা হয়েছিল। তবে তাদের কাছ থেকে ব্রোঞ্জের গয়না ও মাটির পাত্র লুট করা হয়নি; বরং ওগুলো কবরের সঙ্গেই রেখে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া সেখানে একটি জবাই করা বাছুরের হাড়, শস্য পেষার ভাঙা পাথর এবং পোড়া বীজও পাওয়া গেছে। এসব উপাদান ইঙ্গিত দেয় যে হত্যাকাণ্ডের পর একটি প্রতীকী ও আচারসম্মত সমাধি অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছিল।

গবেষকদের মতে, এই গণহত্যা সম্ভবত সেই সময়ের ভূমি ও সম্পদের দখল নিয়ে তীব্র সংঘর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত। লৌহ যুগে নতুন দুর্গ ও বসতি গড়ে ওঠার ফলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ভূখণ্ড নিয়ে দ্বন্দ্ব বেড়ে যায়। গোমোলাভার এই ঘটনাটি থেকে দেখা যায়, সেই সংঘর্ষ কখনও কখনও অত্যন্ত নিষ্ঠুর সহিংসতার রূপ নিয়েছিল।

এই গবেষণা ইউরোপের প্রাগৈতিহাসিক সমাজে ক্ষমতা, সংঘাত এবং সামাজিক সম্পর্ক সম্পর্কে নতুন গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রদান করেছে।

 

সূত্র: A large mass grave from the Early Iron Age indicates selective violence towards women and children in the Carpathian Basin by Linda Fibiger, Miren Iraeta-Orbegozo, published in Nature Human Behaviour, 2026; DOI: 10.1038/s41562-025-02399-9

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × five =