কাঠঠোকরা পাখি প্রকৃতির এক দক্ষ প্রকৌশলী। প্রতিদিন তারা গাছের শক্ত কাণ্ডে হাজার হাজার বার ঠোক্কর দেয়। একটা কাঠঠোকরা দিনে আনুমানিক প্রায় ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ বার পর্যন্ত গাছে আঘাত করতে পারে। এত ঘন ঘন এবং শক্তিশালী আঘাত করার পরও তাদের মস্তিষ্ক বা খুলির কেন কোনো ক্ষতি হয় না? এই বিষয়টা নিয়ে বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের একটা বেশ জোরালো কৌতূহল ছিল। আগে ধারণা করা হতো, কাঠঠোকরার খুলি এক ধরনের প্রাকৃতিক ঘাত-শোষক হিসেবে কাজ করে, যা কিনা প্রতিটি আঘাতের ধাক্কা শোষণ করে মস্তিষ্ককে রক্ষা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা দেখিয়েছে যে বাস্তব চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। গবেষকদের মতে, কাঠঠোকরার খুলি মূলত ঘাত শোষণ করে না; বরং এটি এমনভাবে গঠিত যে আঘাতের শক্তি মাথার ভেতর দিয়ে সোজা ও স্থিতিশীল পথে প্রবাহিত হয়।
আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব লা প্লাটা–এর গবেষক সেবাস্তিয়ান লিয়ন্স এবং তার সহকর্মীরা বিভিন্ন পাখির খুলির গঠন বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে কাঠঠোকরার ঠোঁট, চোয়াল এবং খুলির অংশগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এক সরল রেখায় সাজানো। ফলে যখন কাঠঠোকরা গাছে ঠোক্কর দেয়, তখন আঘাতের শক্তি সরাসরি মাথার ভেতর দিয়ে সোজা পথে চলে যায়, কোনো ঘূর্ণন বা মোচড়ের চাপ তৈরি হয় না।
এই ঠোক্কর মারার জন্য কাঠঠোকরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো চোয়ালের সংযোগস্থল। পাখিদের নীচের চোয়াল খুলির সঙ্গে কোয়াড্রেট নামে একটি হাড়ের মাধ্যমে যুক্ত থাকে। কাঠঠোকরার ক্ষেত্রে এই সংযোগস্থল তুলনামূলকভাবে বেশি সংকুচিত ও চ্যাপ্টা। এর ফলে আঘাতের সময় কম টর্ক বা ঘূর্ণনবল তৈরি হয়, যা খুলির গঠনকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কাঠঠোকরার খুলি অন্যান্য পাখির তুলনায় আলাদা ভাবে বিবর্তিত হয়েছে। অনেক পাখির ক্ষেত্রে শরীর বড় হলে মুখের অংশ লম্বা হয়ে যায়, কিন্তু কাঠঠোকরার ক্ষেত্রে মুখ তুলনামূলকভাবে ছোট এবং মস্তিষ্কের আচ্ছাদন বা ব্রেনকেস বেশি গোলাকার। এই গঠন তাদের মাথাকে শক্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখে এবং আঘাতের সময় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে দেয় না।
শুধু খুলি নয়, ঠোক্কর দেওয়ার সময় কাঠঠোকরার পুরো শরীরটা একসঙ্গে কাজ করে। মাথা, ঘাড়, কোমর, লেজ এবং পেটের পেশি সমন্বিতভাবে শরীরকে শক্তভাবে স্থির রাখে। এমনকি তারা আঘাতের মুহূর্তে শ্বাস ছাড়ে, যা শরীরকে আরও শক্ত করে এবং আঘাতের শক্তি গাছে স্থানান্তর করতে সাহায্য করে।
কাঠঠোকরার খুলি শুধু মস্তিষ্কের আঘাত শোষণ করার জন্য নয়, বরং আঘাতের শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত ও স্থিতিশীলভাবে পরিচালনা করার জন্য বিশেষভাবে গঠিত। এই ধারণা ভবিষ্যতে প্রকৌশল নকশায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, যেখানে আঘাত প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শুধু দৃঢ় উপাদান নয়, বরং শক্তির সঠিক দিকনির্দেশ নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: Skull evolution in woodpeckers via articular innovation and allometric decoupling facilitates pecking performance by Sebastián Lyons, Sergio M. Nebreda, Sergio F. Vizcaíno, First published on 20th February 2026.
https://doi.org/10.1111/joa.70127Digital Object Identifier (DOI)
