ডাইনোসর না কুমীর? 

ডাইনোসর না কুমীর? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ মার্চ, ২০২৬

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যখন কুমিরের পূর্বপুরুষরা রাজত্ব করত। কিন্তু তারা মোটেও আজকের কুমিরের মতো ছিল না। সেই প্রাচীন সরীসৃপদের কেউ ছিল মাটির খুব কাছ দিয়ে চার পায়ে হাঁটা শিকারি, কেউ আবার দেখতে প্রায় ডাইনোসরের মতনই। বিজ্ঞানীরা এখন আরেকটি বিস্ময়কর প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন – সোনসেলাসুকাস সিড্রাস। প্রায় ২২৫ থেকে ২০১ কোটি বছর আগে, ট্রায়াসিক যুগের শেষের দিকে এর অস্তিত্ব ছিল। তখন পৃথিবীর মানচিত্র আজকের মতো ছিল না। উত্তর আমেরিকা ছিল বিশাল এক অতি মহাদেশের অংশ। আর সেই বিস্তীর্ণ ভূমিতে ছড়িয়ে ছিল ঘন বন, নদী আর জলাভূমি। সেখানে ঘুরে বেড়াত সরীসৃপ, উভচর প্রাণী এবং সদ্য উদ্ভূত ডাইনোসরদের প্রথম প্রজন্ম। এই প্রাগৈতিহাসিক বনে বাস করত ছোটখাটো কিন্তু আশ্চর্য গঠনের এই প্রাণী- সোনসেলাসুকাস। উচ্চতা প্রায় ২৫ ইঞ্চি। হালকা শরীর হওয়ায় এরা দ্রুতগতিতে চলাফেরা করত। কিন্তু তার সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল জীবনযাত্রার পরিবর্তন। জীবনের শুরুতে সম্ভবত সে চার পায়ে হাঁটত। বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে দুই পায়ে হাঁটা শুরু করত। এই অদ্ভুত ধারণা এসেছে তার অস্থি বিশ্লেষণ থেকেই। গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, এর সামনের পা আর পিছনের পা একই গতিতে বড় হয়নি। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিছনের পা লম্বা ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ফলে প্রাণীটি ক্রমে দ্বিপদী ভঙ্গিতে দাঁড়াতে এবং হাঁটতে সক্ষম হয়েছে। গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের গবেষক এলিয়ট আর্মার স্মিথ। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছোটবেলায় সোনসেলাসুকাস–এর সামনের ও পিছনের পা প্রায় সমান অনুপাতে ছিল। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিছনের পা দ্রুত বাড়তে থাকে। ফলে প্রাণীটি ধীরে ধীরে চার পা থেকে দুই পায়ে চলাফেরায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। রহস্যময় প্রাণীটির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে পেট্রিফায়েড ফরেস্ট জাতীয় উদ্যান-এ। ২০১৪ সালে সেখানে গবেষকেরা আবিষ্কার করেন এক ঘন ফসিল স্তর। সেখানে একসঙ্গে পাওয়া যায় শত শত হাড়। এখনও পর্যন্ত সেখান থেকে এই প্রজাতির প্রাণীর প্রায় ৯৫০টি হাড় উদ্ধার হয়েছে। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার, পুরো এলাকাটি থেকে ইতিমধ্যে তিন হাজারেরও বেশি ফসিল পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এটি কেবল একটি প্রাণীর কাহিনী নয়, এ প্রায় ২০ কোটি বছরের পুরোনো এক সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের জানালা। সোনসেলাসুকাস ছিল ‘শুওভোসরিড’ নামের এক অদ্ভুত সরীসৃপ গোষ্ঠীর সদস্য। এই গোষ্ঠীর অনেক প্রাণীর শরীর দেখতে ডাইনোসরের মতো। বিশেষ করে অর্নিথোমিমিড ডাইনোসর–এর সঙ্গে এদের মিল সবচেয়ে বেশি। এই সময়কার পাখির মতো গড়নের থেরোপড ডাইনোসর সব থেকে দ্রুত দৌড়াত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সোনসেলাসুকাস মোটেও ডাইনোসর ছিল না। এ ছিল আর্কোসর পরিবারের কুমির-শাখার সদস্য । তবু তার শরীরে ডাইনোসরদের মতো বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। যেমন, দাঁতহীন ঠোঁটের মতো মুখ, বড় চোখের কোটর, আর ফাঁপা হাড়। এই ফাঁপা হাড় সাধারণত হালকা শরীরের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা বেগে দৌড়ানোর জন্য উপযোগী। এই মিল আসলে সমান্তরাল বিবর্তন নামক এক বৈজ্ঞানিক ঘটনার উদাহরণ। এতে সম্পূর্ণ ভিন্ন বংশের প্রাণীরা একই পরিবেশে বাস করতে গিয়ে আলাদা আলাদা পথ ধরে প্রায় একই ধরনের বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে। সোনসেলাসুকাস–এর নামও তার আবিষ্কারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। “সোনসেলাসুকাস’’ নামটি এসেছে চিনলে শিলাস্তর–এর একটি স্তর থেকে, যার নাম সোনসেলা স্তর। সেখানেই এই জীবাশ্মগুলো পাওয়া গেছে। আর “সেড্রাস” অংশটি এসেছে সেডার বা দেবদারু গাছ থেকে, যেগুলো সেই সময়ের বনে প্রচুর ছিল। ধরা যায়, প্রায় ২০ কোটি বছর আগে সেই সেডার বনের ভেতর দিয়ে দ্রুত ছুটে বেড়াত ছোট্ট এই সরীসৃপটি। আজ সেই বনের প্রতিটি ফসিল যেন একেকটি কালখণ্ড। আর সোনসেলাসুকাস–এর হাড়গুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কুমিরদের ইতিহাস শুধু জলাভূমির এক অলস শিকারির গল্প নয়। তার গভীরে লুকিয়ে আছে দৌড়ানো, বিবর্তিত হওয়া, আর অদ্ভুত রূপ বদলের এক বিস্ময়কর প্রাগৈতিহাসিক অধ্যায়।

 

সূত্র: Journal of Vertebrate Paleontology ; Earth . com March, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − 13 =