মহাবিশ্বে মহাকাশে মানুষ একা?

মহাবিশ্বে মহাকাশে মানুষ একা?

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২১ মার্চ, ২০২৬

অনন্ত মহাকাশ। কোটি কোটি নক্ষত্রপুঞ্জ, তার চেয়েও বেশি নক্ষত্র আর গ্রহ। আমরা শুনতে চাই এমন কণ্ঠস্বর, যা পৃথিবীর নয়। দশকের পর দশক ধরে আমরা ভিনগ্রহের প্রাণের সন্ধান করছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত সংকেত আমাদের কানে এসে পৌঁছায়নি। এই নীরবতা কি কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর নিয়ম? এই রহস্য ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানীদের একাংশ ভরসা করেন ‘ডার্ক ফরেস্ট থিওরি’বা ‘আঁধার অরণ্য তত্ত্ব’-এ। চীনা লেখক লিউ সিক্সিনের ২০০৮ সালের উপন্যাস ‘দ্য ডার্ক ফরেস্ট’ থেকে এই ধারণাটি জনপ্রিয় হলেও, বিজ্ঞানের জগতে এর শিকড় আরও গভীরে। তত্ত্বানুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রতিটি বুদ্ধিমান সভ্যতা যেন একেকটি শিকারি এবং তারা অন্ধকার অরণ্যে লুকিয়ে আছে। কেউ যদি নিজের উপস্থিতি জানান দেয়, তাহলে হয়তো আরও উন্নত, আরও আক্রমণাত্মক কোনো সভ্যতা মুহূর্তেই তাকে ধ্বংস করে দেবে। তাই উভয়পক্ষই চুপ রয়েছে। সেটি (SETI) ইনস্টিটিউট এবং ব্রেকথ্রু লিসেন প্রকল্পের গবেষক বিশাল গজ্জরের মতে, “পুরো মহাবিশ্বটাই এখনও আমাদের জন্য এক অন্ধকার বন। অন্ধকার বনে দাঁড়িয়ে কেউই চিৎকার করে নিজের অবস্থান জানাতে চায় না।‘’তিনি সরাসরি ‘কখনোই’ শব্দটি ব্যবহার করছেন না বরং বলছেন, “এখনও।‘’ কারণ আমরা এখনও প্রযুক্তিগতভাবে প্রস্তুত নই। আর মানবসভ্যতাও এখনও ভীষণ বিভক্ত। তবুও অনুসন্ধান থেমে নেই। ব্রেকথ্রু লিসেন এবং অন্যান্য প্রকল্পগুলি খুঁজছে সেই “কণ্ঠস্বর’’। একটি সংকেত, যা প্রমাণ করবে ‘আমরা একা নই’। কিন্তু সমস্যাটা কোথায়? প্রথমত, আমরা কী খুঁজছি, সেটাই হয়তো বেঠিক। দীর্ঘ ৬০–৭০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা মূলত “ন্যারোব্যান্ড’’ সংকেত খুঁজেছেন, অর্থাৎ একেবারে নির্দিষ্ট একটি কম্পাঙ্কের তীক্ষ্ণ, সরু সংকেত। কারণ প্রকৃতির ঝড়, সমুদ্র, আগুন প্রভৃতি উৎস ঠিক এভাবে একক ফ্রিকোয়েন্সিতে শব্দ তৈরি করতে পারে না। তাই এমন সংকেত দেখলেই বোঝা যাবে, এটি কৃত্রিম। তবে বিষয়টিকে একটু রেডিও টিউন করার মতো ভাবা যাক। তাতে একটা নির্দিষ্ট স্টেশনে গেলে পরিষ্কার শব্দ পাওয়া যায়। আবার একটু সরলেই সব হারিয়ে যায়। আর এখানেই সমস্যা। ধরা যাক, কোনো দূর গ্রহ থেকে এই সংকেত আসছে। সেই গ্রহ যদি নিজের নক্ষত্রের পেছনে চলে যায়, তাহলে সংকেতকে নক্ষত্রের চারপাশের উত্তপ্ত প্লাজমা আর অশান্ত পরিবেশ পেরিয়ে আসতে হবে। এই পথে সংকেতের ধারালো রূপ ভেঙে যাবে, ছড়িয়ে পড়বে নানা কম্পাঙ্কে। ফলে আমাদের বর্তমান যন্ত্রগুলো সেই সংকেতকে স্রেফ মহাজাগতিক কোলাহল ভেবে এড়িয়ে যায়। মানে, সংকেত থাকলেও হয়ত আমরা সেটা বুঝতে পারছি না। এমন ভুল আগেও হয়েছে। BLP-1 নামে একটি সংকেত, চীনের FAST টেলিস্কোপে ধরা পড়া আরেকটি অদ্ভুত সংকেত সবই একসময় উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, এগুলি পৃথিবীরই নিজস্ব রেডিও ব্যাঘাত। তাহলে কি আমরা ভুল জায়গায় খুঁজছি? বিশাল গজ্জর এবং তার দল সম্প্রতি একটি গবেষণাপত্রে বলেছেন, বিষয়টি আংশিকভাবে তেমনটাই। তিনি বলছেন, শুধু ন্যারোব্যান্ড নয়, আমাদের “ব্রডব্যান্ড’’ সংকেতও খুঁজতে হবে। প্রকৃতির সংকেত সাধারণত একাধিক কম্পাঙ্কে ছড়িয়ে পড়ে। আর মহাকাশের মধ্য দিয়ে ভ্রমণের সময় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। উচ্চ কম্পাঙ্ক আগে পৌঁছায়, নিম্ন কম্পাঙ্ক পরে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু যদি কোনো বুদ্ধিমান সভ্যতা ইচ্ছাকৃতভাবে এই ক্রম উল্টে দেয়? আগে নিম্ন কম্পাঙ্ক পাঠায়, পরে উচ্চ? তাহলে সেটা হবে প্রকৃতির নিয়ম ভাঙা এক কৃত্রিম স্বাক্ষর, আরেকটি সূত্র-প্যাটার্ন। তাছাড়া প্রাকৃতিক সংকেত এলোমেলো, এর কোনো স্থায়ী গঠন নেই। কিন্তু তথ্যবাহী সংকেতের ভিতরে থাকে ছন্দ, পুনরাবৃত্তি, পরিসংখ্যানগত শৃঙ্খলা, যাকে বলা হয় ‘চক্র-স্থিতিশীলতা’। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি এমন এক বৈশিষ্ট্য যেখানে কোনো সংকেতের পরিসংখ্যানগত বিন্যাস সময়ের সঙ্গে পুনরাবৃত্ত হয় বা নিয়ম মেনে ঘোরে। এই ধরনের সূক্ষ্ম নিয়ম এখনও বেশিরভাগ অনুসন্ধানে উপেক্ষিত।

এক্ষেত্রে আরও একটা সম্ভাবনা হচ্ছে, আমরা হয়তো ভুল কম্পাঙ্কয় শুনছি। এখনকার বেশিরভাগ অনুসন্ধান ১.৪ গিগাহার্টজের আশেপাশেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু হয়ত উন্নত কোন সভ্যতা অনেক উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সিতে বার্তা পাঠাচ্ছে, যেখানে বিকৃতি কম। সুখবর হলো, নতুন প্রজন্মের টেলিস্কোপ এখন ১ থেকে ১০০ গিগাহার্টজ পর্যন্ত বিশাল পরিসরে অনুসন্ধান করতে পারছে। গজ্জরের ভাষায়, “এটা মানবজাতির সবচেয়ে পুরনো প্রশ্ন, আমরা কি একা?” হয়তো আগামী এক দশকের মধ্যেই আমরা অন্তত খুঁজে পাব জীবনের চিহ্ন, অন্য গ্রহের বায়ুমণ্ডলে রাসায়নিক স্বাক্ষর, জৈব কার্যকলাপের ইঙ্গিত। কিন্তু যদি কখনও আমরা এমন একটি সংকেত পাই, যা নিঃসন্দেহে কৃত্রিম, দূর নক্ষত্রের ওপার থেকে আসা- তাহলে সেটা হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। আর তখন প্রশ্নটা বদলে যাবে। আমরা কি উত্তর দেব? নাকি, অন্ধকার বনের নিয়ম মেনে, চুপ করে থাকব?

তবে বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন আরও সূক্ষ্ম কিছু, অনিচ্ছাকৃতভাবে ফাঁস হওয়া সংকেত, যাকে বলা হয় “লিকেজ রেডিয়েশন”। একটা সভ্যতা হয়তো নিজেরাই বুঝতে পারছে না যে তাদের প্রযুক্তির আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে মহাশূন্যে। কিন্তু এই অনুসন্ধানে এক বড় ভুল হল, আমরা ভেবেছিলাম সমস্যাটি কেবল আমাদের দিক থেকেই। সূর্যের “স্পেস ওয়েদার” বা মহাজাগতিক আবহাওয়া যে সংকেত বিকৃত করতে পারে, সেটা জানা ছিল। তাই আমরা সূর্যের দিক এড়িয়ে খুঁজেছি। কিন্তু নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে এক অস্বস্তিকর সত্য। সমস্যা শুধু আমাদের পাশে নয়, উৎসের কাছেও হতে পারে। অর্থাৎ, সংকেত যেখান থেকে আসছে, সেই গ্রহ, সেই নক্ষত্রের আশপাশেই সংকেত বিকৃত হয়ে যেতে পারে। আর সেই বিকৃতির ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই কাহিনীর কেন্দ্রে আছে এক বিশেষ ধরনের বামন নক্ষত্র- M ডোয়ার্ফ। আমাদের আকাশগঙ্গা গ্যালাক্সির প্রায় ৭৫% নক্ষত্রই এই শ্রেণির। ছোট, ম্লান, কিন্তু অবিশ্বাস্যরকম দীর্ঘজীবী। আমাদের সূর্যের বয়স প্রায় ৫০০ কোটি বছর। আরও ৫০০ কোটি বছর পরে হয়ত তার মৃত্যু হবে। সেখানে একটি লাল বামন নক্ষত্র হাজার হাজার কোটি বছর বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। দীর্ঘ সময় মানে জীবনের বিকাশের জন্য বেশি সুযোগ। জীবন জন্ম নেবে, বিবর্তিত হবে, বুদ্ধিমত্তা অর্জন করবে, প্রযুক্তি বানাবে। সবকিছুর জন্য সময় আছে। কিন্তু সমস্যাটা সেখানেই। নক্ষত্রগুলোর আশপাশে “মহাজাগতিক আবহাওয়া’’ ভয়ঙ্কর। প্রচণ্ড প্লাজমা, শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র, তীব্র নাক্ষত্রিক ঝড় আর বারবার ঘটে যাওয়া ‘করোনাল মাস ইজেকশন’। যেখানে বিপুল পরিমাণ শক্তি ও চার্জযুক্ত কণিকা ছিটকে বের হয়। এই নক্ষত্রগুলো ছোট হওয়ায়, তাদের গ্রহগুলোকে খুব কাছাকাছি ঘুরতে হয়, যাতে জীবনের উপযোগী তাপমাত্রা থাকে। ফলে সেই গ্রহগুলো যেন এক আগুনের চুল্লির একদম পাশে বসে আছে। তাতে সংকেত সেখান থেকে বেরোলেও,শুরুতেই বিকৃত হয়ে যেতে পারে, মহাশূন্যে আসার আগেই। এই কারণেই গবেষণাটি এত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা যেসব নক্ষত্রে জীবনের সম্ভাবনা বেশি ভাবছি, সেগুলোর বেশিরভাগই এই বিপজ্জনক পরিবেশে রয়েছে।

আমাদের অনুসন্ধানের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা ধরে নিচ্ছি জীবন “বাসযোগ্য অঞ্চলে” থাকবে। অর্থাৎ, এমন দূরত্বে যেখানে তরল জল থাকতে পারে। খুব কাছে হলে জল বাষ্প হয়ে যাবে, খুব দূরে হলে বরফ। এই ধারণা খারাপ নয়। কারণ আমরা জীবনকে জল-নির্ভর হিসাবেই দেখি। কিন্তু যদি অন্য ধরনের জীবন থাকে? যদি তারা একেবারেই ভিন্ন পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে, যেখানে তরলের প্রয়োজন নেই?

আরেকটি সম্ভাবনা হল, সংকেত পাঠানো হচ্ছে নক্ষত্রের অনেক দূরের কোনো জায়গা থেকে। যেখানে এই বিকৃতির প্রভাব কম। তারপর আসে আরও জটিল এক বাস্তবতা- ‘বাইনারি স্টার সিস্টেম’। ছায়াপথের প্রায় অর্ধেক নক্ষত্রই জোড়ায় জোড়ায় থাকে। সেখানে দুটি নক্ষত্র একে অপরকে ঘিরে ঘোরে। এই সিস্টেমে মহাজাগতিক আবহাওয়া আরও বিশৃঙ্খল। মাধ্যাকর্ষণ, প্লাজমা, চার্জযুক্ত কণিকার এক অদ্ভুত নাচ। অর্থাৎ, আমরা এখনো সমস্যার সহজ সংস্করণটাই দেখছি মাত্র। তবুও একটা বিষয় পরিষ্কার, যে-ই হোক, যত উন্নতই হোক, সবাইকে শক্তির নিয়ম মানতেই হবে। শক্তি সীমিত। তাই দূরত্ব পেরিয়ে যোগাযোগের জন্য রেডিও তরঙ্গ এখনও সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। এক্স-রে বা গামা রে ব্যবহার করলে শক্তির খরচ আকাশছোঁয়া আর সেগুলো মহাশূন্যেই শোষিত হয়। কিন্তু যোগাযোগের আরেকটা মৌলিক সমস্যা- দূরত্ব। আমাদের নিকটতম নক্ষত্র প্রায় ৪ আলোকবর্ষ দূরে। সেখান থেকে সংকেত এলে আমাদের কাছে পৌঁছাতে ৪ বছর লাগবে। আমরা যদি জবাব দিই, সেটাও পৌঁছাতে লাগবে আরও ৪ বছর। মানে, একটা প্রশ্ন-উত্তরে ৮ বছর!

আজকাল ‘আনআইডেন্টিফাইড অ্যানোমালাস ফেনোমেনা’ বা ইউএফও নিয়ে অনেক মুখরোচক গল্প শোনা যায়। বিজ্ঞানী হিসেবে গজ্জর এই সব তত্ত্বের ব্যাপারে বেশ সন্দিহান। তার মতে, বিজ্ঞান চলে প্রমাণ এবং ফলের পুনরাবৃত্তির ওপর। সাধারণ মানুষের অস্পষ্ট পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে ধোপে টেকে না। তবুও তিনি আশাবাদী। গত ২০ বছরে আমরা প্রায় ৬,০০০টি দূরগ্রহ (Exoplanet) আবিষ্কার করেছি। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ এখন ওই সব গ্রহের বায়ুমণ্ডলের উপাদানও পরীক্ষা করতে পারছে। হয়তো আগামী ১০ বছরের মধ্যেই আমরা ভিনগ্রহে কোনো না কোনো জৈবিক অস্তিত্বের প্রমাণ পাব। তাছাড়া আমরা এখনো নিজেদের মধ্যেই শতধা বিভক্ত। পুরো মানবজাতি এক হয়ে কী বার্তা পাঠাবে, সে বিষয়ে কোনো ঐকমত্য নেই। আমরা মহাকাশের এই বিশাল অরণ্যে এক নবীন প্রজাতি। যতক্ষণ না আমরা নিজেদের সুরক্ষিত করার মতো উন্নত হচ্ছি এবং মহাজাগতিক পরিবেশকে ভালোভাবে বুঝছি, ততক্ষণ চুপচাপ থাকাই হয়তো আমাদের টিকে থাকার সেরা কৌশল। তবে কৌতূহল তো দমে থাকার নয়। টেলিস্কোপের লেন্সে চোখ রেখে মানুষ আজও খুঁজে চলেছে সেই পরম সত্যকে- আমরা কি সত্যিই এই মহাবিশ্বে মহাকাশে একাকী?

 

সূত্র: Nautilus; Astronomy; Why Haven’t We Heard from Extraterrestrials Yet? March 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × one =