মহাবিশ্ব কি মায়া?

মহাবিশ্ব কি মায়া?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ মার্চ, ২০২৬

কয়েক বছর ধরেই এক অদ্ভুত ধারণা বিজ্ঞান ও দর্শনের জগতে বার বার উঠে আসছে- আমাদের এই বাস্তব জগৎ নেহাত বাস্তব নয়। এ হয়তো কোনো অতি উন্নত সভ্যতার তৈরি বিশাল কম্পিউটার সিমুলেশন! অর্থাৎ আমরা, আমাদের পৃথিবী, নক্ষত্রমণ্ডল এ সবকিছুই হয়তো কোনো মহাজাগতিক “কোড”-এর ফল। এই ধারণাকে বলা হয় ‘সিমুলেশন হাইপোথেসিস’। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু গাণিতিক বিশ্লেষণ ও তাত্ত্বিক গবেষণার পর পদার্থবিদরা বলছেন, বাস্তবে আমাদের মহাবিশ্বকে কম্পিউটার দিয়ে সিমুলেট করা প্রায় অসম্ভব। তাঁরা সম্পূর্ণ বিষয়টিকে মূলত তিন দিক থেকে খতিয়ে দেখেছেন। এক, হল, কম্পিউটেশনাল সীমা। দুই, শক্তি ও সম্পদের প্রয়োজনীয়তা। তিন, পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম। প্রথমেই আসে তথ্যের পরিমাণ। মহাবিশ্বে প্রায় 10⁸⁰ সংখ্যক কণা আছে – প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন এবং আরও নানা মৌলিক কণা । এদের প্রত্যেকটির অবস্থান, গতি, শক্তি এবং পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতি মুহূর্তে হিসাব করে রাখতে হলে প্রয়োজন হবে অকল্পনীয় পরিমাণ তথ্যসংরক্ষণ ও গণনা। একটি বাস্তবসম্মত সিমুলেশন চালাতে হলে প্রতিটি কণার আচরণকে ক্রমাগত হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের প্রতিটি ক্ষুদ্র পরিবর্তনকে ডিজিটালভাবে “আপডেট” করতে হবে। কিন্তু পরিচিত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী এত বিপুল তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য যে পরিমাণ শক্তি ও গণনাশক্তি দরকার, তা নিজেই প্রায় একটি মহাবিশ্বের সমান । আর এখানেই তৈরি হয় বড় সমস্যা। তাদের হিসাব বলছে, একটি সম্পূর্ণ মহাবিশ্বকে নিখুঁতভাবে সিমুলেট করতে গেলে যে কম্পিউটার দরকার, সেটি চালানোর জন্য এত বিপুল শক্তি ও পদার্থ প্রয়োজন হবে যে সেটি নিজেই একটি মহাবিশ্বের সমতুল্য হয়ে দাঁড়াবে। সহজভাবে বললে, একটি মহাবিশ্বকে চালাতে আরেকটি মহাবিশ্ব দরকার। এর পাশাপাশি রয়েছে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের জটিলতা। কোয়ান্টাম স্তরে কণারা সম্ভাবনার মেঘের মতো আচরণ করে, যেখানে একই সঙ্গে বহু সম্ভাব্য অবস্থার অস্তিত্ব থাকতে পারে। এই আচরণকে নিখুঁতভাবে সিমুলেট করতে গেলে যে পরিমাণ তথ্য ও গণনা প্রয়োজন, তা সাধারণ অ্যালগরিদম দিয়ে সামলানো প্রায় অসম্ভব। কসমোলজি বা মহাকাশতত্ত্বও একইভাবে বিস্ময়কর। মহাজাগতিক প্রসারণ, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি- এসব ঘটনাই এত জটিল ও সূক্ষ্ম যে এগুলিকে একটি ডিজিটাল সিস্টেমে পুরোপুরি অনুকরণ করা কার্যত অবাস্তব। তবে এই ফলাফল কোনোভাবেই মহাবিশ্বের রহস্যকে কমিয়ে দেয় না, বরং উল্টোটা । যদি আমরা সত্যিই কোনো সিমুলেশনের ভেতরে না থাকি, তাহলে এই মহাবিশ্ব নিজেই এক অনন্য বাস্তবতা। এক বিশাল, জটিল এবং গভীর কাঠামো, যার প্রতিটি স্তরে লুকিয়ে আছে নতুন নতুন রহস্য। কোয়ান্টাম জগৎ থেকে শুরু করে গ্যালাক্সির মহাসমুদ্র- সবখানেই এমন সব আচরণ ও প্যাটার্ন দেখা যায়, যা কোনো সরল কম্পিউটার কোডের সীমা ছাপিয়ে যায়। এই উপলব্ধি বিজ্ঞানীদের কাছে নতুন অনুপ্রেরণা এনে দেয়। কারণ তখন মহাবিশ্ব আর কোনো কৃত্রিম পরীক্ষাগার নয়, তা সত্যিকারের এক মহাজাগতিক বাস্তবতা। যেখানে প্রতিটি আবিষ্কার মানে প্রকৃতির গভীর কোনো সত্যের সন্ধান। অতএব প্রশ্নটি হয়তো এখন বদলে যাচ্ছে। “আমরা কি সিমুলেশনের মধ্যে আছি?” এই প্রশ্নের বদলে নতুন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, “বাস্তব মহাবিশ্বটি এত বিস্ময়কর কেন”? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আসছে নতুন সমীকরণ, নতুন টেলিস্কোপ আর নতুন কল্পনার স্রোত।

 

সূত্র: Quantum Cookie

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 − three =