মানুষ যদি একদিন চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়তে চায়, তবে কয়েকটি মৌলিক জিনিস দরকার হবে। প্রথমত অক্সিজেন, যা চাঁদে প্রচুর পরিমাণে আছে, যদিও তা খনিজের সঙ্গে রাসায়নিকভাবে বাঁধা অবস্থায় রয়েছে। দ্বিতীয়ত জল, যা বরফের আকারে জমে আছে চাঁদের মেরু অঞ্চলে। আর তৃতীয়ত দরকার খাদ্য। এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ মহাকাশে খাবার পাঠানো তো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে সেটা টেকসই-ও হবে না। তাই বিজ্ঞানীরা এখন ভাবছেন, চাঁদের মাটিতেই কি খাদ্য উৎপাদন সম্ভব? সম্প্রতি টেক্সাসের অস্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেছেন। এদের সঙ্গে কাজ করেছেন টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরাও। পরীক্ষায় দেখা গেছে, চাঁদের মাটিতে ছোলা গাছ জন্মানো সম্ভব। চাঁদের মাটিকে বলা হয় ‘রেগোলিথ’। এটি সূক্ষ্ম গুঁড়োর মতো পদার্থ, যার মধ্যে বিভিন্ন খনিজ এবং ভারী ধাতু মিশে রয়েছে। এর অনেকগুলোই উদ্ভিদের জন্য বিষাক্ত। পৃথিবীর মাটির সঙ্গে এর পার্থক্য বিশাল। আমাদের মাটিতে থাকে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং তাদের তৈরি জৈব পদার্থ । গাছের বৃদ্ধির জন্য এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু চাঁদের রেগোলিথে এসব কিছুই নেই। তাই একে কার্যত “মরা মাটি” বলা যায়। এক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হল, শেষবার মানুষ চাঁদে গিয়েছিল অর্ধশতাব্দীরও বেশি আগে, সেই অ্যাপোলো মিশন–এর সময়। সেই অভিযান থেকে আনা নমুনাগুলো গবেষণার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান হলেও এটি এখন খুবই সীমিত পরিমাণে রয়েছে। এই সমস্যার সমাধানে গবেষকেরা সাহায্য নেন ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার এক্সোলিথ ল্যাবরেটরির। এখানে তৈরি করা হয় চাঁদের মাটির কৃত্রিম সংস্করণ, যা অ্যাপোলো অভিযানের নমুনা বিশ্লেষণ করে বানানো হয়েছে। এরপর শুরু হয় আসল পরীক্ষা। গবেষকেরা রেগোলিথের সঙ্গে মেশান ‘ভার্মিকম্পোস্ট’ অর্থাৎ কেঁচোর তৈরি জৈব সার। এতে থাকে নানা উপকারী অণুজীব। পাশাপাশি ছোলার শিকড়ে লাগানো হয় বিশেষ ধরনের সহাবস্থানকারী ছত্রাক, যার নাম আরবাসকুলার মাইকোরাইজাল। এই ছত্রাক উদ্ভিদের সঙ্গে সহাবস্থান করে এবং মাটি থেকে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে গাছকে যোগান দেয়। একই সঙ্গে এটি ভারী ধাতুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও গাছকে কিছুটা রক্ষা করে। বিভিন্ন অনুপাতে উপাদানগুলো মিশিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে গবেষকেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল পান। দেখা যায়, যদি মাটির মধ্যে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত রেগোলিথ-ই থাকে, তবুও ছোলা গাছ পূর্ণবয়স্ক হয়ে ফলন দিতে পারছে। কিন্তু তার বেশি রেগোলিথ থাকলে গাছ টিকে থাকতে পারবে না। সহায়ক ছত্রাকটি রেগোলিথের মিশ্রণে সফলভাবে বসতি গড়তে পারে। অর্থাৎ একবার ছত্রাক যোগ করলেই ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল “জীবন্ত মাটি” তৈরি হতে পারে। চাঁদের মাটিতে ছোলা ফলানো অবশ্যই মহাকাশ কৃষির পথে একটি বড় পদক্ষেপ। তবে এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি। এই ছোলা মানুষের পক্ষে নিরাপদ কি? সেই উত্তর পাওয়া না পর্যন্ত চাঁদের রান্নাঘরে ‘জৈব মাটি’ বানানোর পরিকল্পনা আপাতত স্থগিতই থাকছে।
সূত্র : Nautilus Magazine
