আমরা অজান্তেই প্রতিদিন অসংখ্য ছত্রাকের বীজরেণু শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করছি। এগুলির বেশিরভাগই আমাদের শরীরের কোনো ক্ষতি না করেই বেরিয়ে যায়। কিন্তু কিছু বিশেষ ধরনের ছত্রাক মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটাতে পারে, ফসল নষ্ট করতে পারে এমনকি পরিবেশগত ভারসাম্যকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। এই কারণেই ছত্রাক আজ শুধু একটি জীববৈজ্ঞানিক বিষয় নয়, বিশ্বজোড়া এক উদ্বেগ। পার্থিব জীবজগতের জন্য ছত্রাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরা মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহ ভেঙে পুষ্টি পুনর্ব্যবহার করে, যা বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখে। কিন্তু এই উপকারী ভূমিকাটির পাশাপাশি কিছু প্রজাতি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। একই ছত্রাক একদিকে যেমন বনজ মাটিতে পচন প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, অন্যদিকে আবার মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে কিংবা কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতি করছে। এরকম দ্বৈত চরিত্রের ছত্রাকের এক বড় উদাহরণ অ্যাসপারজিলাস। এদের মধ্যে কিছু প্রজাতি হাসপাতাল, খামার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ, সব জায়গায় সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে এরা স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং পরিবেশ এই তিনটি ক্ষেত্রের মধ্যে একটি অদৃশ্য সংযোগ তৈরি করে ফেলে। সাধারণত আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এই ছত্রাককে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত ছত্রাক-হন্তা ব্যবহার এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এহেন ছত্রাক আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফলে যে জীব একসময় উপকারী ছিল, সেটিই এখন গুরুতর সংক্রমণ, খাদ্যদূষণ এবং ওষুধ-প্রতিরোধী রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই পরিবর্তনের বিষয়টি বোঝার জন্য ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের নরম্যান ভ্যান রাইন এবং তাঁর সহকর্মীরা গবেষণা চালান। তাঁরা অ্যাসপারজিলাস ফ্লাভাস, অ্যাসপারজিলাস ফিউমিগেটাস এবং অ্যাসপারজিলাস নাইজার- এই তিনটি বিপজ্জনক প্রজাতির ভবিষ্যৎ বংশবিস্তার নিয়ে মডেল তৈরি করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি ব্যবহার করে তারা দেখেন, ভবিষ্যতে এগুলো কীভাবে ছড়াতে পারে। তাতে দেখা যাচ্ছে, একটি উচ্চ-দূষণের পরিস্থিতি (SSP585) অনুযায়ী, ইউরোপের এক বড় অংশ এই ছত্রাকগুলোর জন্য আরও অনুকূল হয়ে উঠবে। যেমন, অ্যাসপারজিলাস ফিউমিগেটাস-এর বিস্তার ৭৭ শতাংশেরও বেশি বাড়তে পারে। ফলে, আরও লক্ষ লক্ষ মানুষ সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়বে। অ্যাসপারজিলাস ফ্লাভাস-এরও উল্লেখযোগ্য বংশবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। এই ছত্রাক বিস্তারের একটি বড় কারণ হল, এর জিনগত নমনীয়তা। অর্থাৎ, পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এটি দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। মাটি, শস্য, প্রাণীর পালক, এমনকি প্রবাল কাঠামোতেও এরা বেঁচে থাকতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশে এগুলি পুষ্টি পুনর্ব্যবহার করে, কিন্তু কৃষিক্ষেত্র বা হাসপাতালে এগুলিই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সমস্যার আরেকটি দিক হল, এদের ওষুধ-প্রতিরোধ ক্ষমতা। কৃষিক্ষেত্রে ফসল রক্ষার জন্য যে অ্যাজোল ধরনের ছত্রাকহন্তা ব্যবহার করা হয়, চিকিৎসাতেও প্রায় সেই একই ধরনের ওষুধ ব্যবহৃত হয়। ফলে পরিবেশে থাকা ছত্রাক ধীরে ধীরে এই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা পরে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটালে চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা, যেমন ঝড় বা ধুলিঝড় এই সবকিছু ছত্রাকের বিস্তারে প্রভাব ফেলে। যেমন, বাতাসে বেশি বীজরেণু ছড়িয়ে পড়লে সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে। ইতিমধ্যে হাসপাতালগুলোতে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা COVID-19 রোগীদের মধ্যে এমন সংক্রমণ দেখা গেছে। এছাড়াও, এই ছত্রাক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। কিছু অ্যাসপারজিলাস প্রজাতি মাইকোটক্সিন নামের বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করে, যা শস্যদূষণ ঘটায়। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ে। যেমন, এক বছরে শুধু ভুট্টা-র বিপুল ক্ষতি হতে পারে। বিশ্বজুড়ে ছত্রাক সংক্রমণের বিষটি এখনও অনেকটাই অবহেলিত। ২০২২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যাসপারজিলাস এবং ক্যানডিডা–কে গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান বিপদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। কিন্তু এখনও ছত্রাক নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে কম। পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ ছত্রাক প্রজাতি থাকলেও, খুব অল্প সংখ্যকই ভালোভাবে গবেষিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত নজরদারি জরুরি। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ, কৃষিক্ষেত্র থেকে নমুনা সংগ্রহ এবং হাসপাতালের তথ্য একত্রিত করে ছত্রাকের বিস্তারের ধারা অনুসরণ করা যেতে পারে। এতে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। তবে সমাধান একক কোনো পথে সম্ভব নয়। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো, ছত্রাকনাশকের যথাযথ সঠিক ব্যবহার, বায়ু চলাচলের উন্নতি, এবং নতুন ছত্রাক-বিরোধী ওষুধ তৈরি- সবকিছু মিলিয়েই ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
সূত্রঃ Climate change-driven geographical shifts in Aspergillus species habitat and the implications for plant and human health; Research Square; March 2026.
