পাখিদের উড়ান পথের মানচিত্র

পাখিদের উড়ান পথের মানচিত্র

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ মার্চ, ২০২৬

প্রতি বছর অসংখ্য তটভূমির পাখি বা ‘শোরবার্ড’ মহাদেশ পেরিয়ে দীর্ঘ যাত্রা করে। তাদের এই যাত্রার মাধ্যমে তারা দূরবর্তী বাস্তুতন্ত্রগুলিকে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রাখে। এক জায়গায় খাবার খাওয়ার পর একটি পাখি কয়েক সপ্তাহ পরেই হয়তো হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের আরেকটি আবাসস্থলের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই অবিরাম চলাচল তাদের টিকে থাকা কঠিন করে তুলছে। বিশেষ করে যখন সেই গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলগুলো একের পর এক হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। এই জটিল সমস্যার সমাধান খুঁজতে স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জু ও কনজারভেশন বায়োলজি ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা নতুন প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছেন। আগে এই পাখিরা কোথায় যায়, তা জানার জন্য গবেষকদের অনেকটাই অনুমানের উপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু এখন ছোট ‘ইলেকট্রনিক ট্র্যাকিং ট্যাগ’ সেই চিত্র বদলে দিচ্ছে। গবেষকরা পাখিদের শরীরে ক্ষুদ্র টিকলি বসিয়ে দেন, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অবস্থানের তথ্য পাঠায়। ফলে বিজ্ঞানীরা এখন পাখির সম্পূর্ণ পরিযান পথ অনুসরণ করতে পারেন। শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু দেখা নয়, একেবারে গোটা যাত্রাপথের মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। তথ্যগুলো বেশ চমকপ্রদ। দেখা যাচ্ছে, একটি পাখি তার যাত্রাপথে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে থামে। কখনও কয়েক দিন, কখনও কয়েক সপ্তাহের জন্য। কেউ সরল পথে উড়ে যায়, আবার কেউ ঘুরপথে। এটি মূলত নির্ভর করে আবহাওয়া, খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং ভৌগোলিক অবস্থার উপর। এই পথরেখা উপাত্ত শুধু পথ দেখায় না, পাখিদের আচরণও ব্যাখ্যা করে। ব্যাখ্যা করে, কীভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের পাখির দল একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং বছরের কোন সময়ে কোন আবাসস্থল তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রথম নজরে মনে হতেই পারে, শোরবার্ডদের কোনো সমস্যা নেই। অনেক জায়গায় এখনও বড় বড় ঝাঁক দেখা যায়, যা প্রাচুর্যের ধারণা দেয়। কিন্তু সামগ্রিক চিত্র ভিন্ন। ১৯৮০ সালের পর থেকে উত্তর আমেরিকার অর্ধেকেরও বেশি শোরবার্ড প্রজাতির সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এই পতন আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন আমরা তাদের পরিযান পদ্ধতি বুঝতে শুরু করি। শোরবার্ডরা একক কোনো আবাসস্থলের উপর নির্ভর করে না। বরং তাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে একাধিক দেশের বিস্তৃত এক শৃঙ্খলের উপর। এই শৃঙ্খলের একটি গ্রন্থি ভেঙে গেলে পুরো ব্যবস্থাটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। এদিকে জলাভূমি শুকিয়ে যাচ্ছে, উপকূলের গঠন বদলাচ্ছে, এবং মানুষের কার্যকলাপ ক্রমাগত পরিবেশকে পরিবর্তন করছে। ফলে এই পাখিদের উপর চাপ বাড়ছে, যারা নির্ভুল সময় ও নির্ভরযোগ্য বিরাম স্থানের উপর নির্ভরশীল। এই সমস্যার সমাধানে ২০২১ সালে তৈরি হয় শোরবার্ড বিজ্ঞান ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা। এর কাজের পরিধি বিশাল। ৭৫টি সংস্থা একত্রিত হয়ে ৩৬টি প্রজাতির উপর ৭.১ কোটিরও বেশি পর্যবেক্ষণ তথ্য সংগ্রহ করেছে। একটি ডেটাসেট আলাদাভাবে ছোট গল্প বললেও, সবগুলো একত্রে একটি বড় চিত্র তুলে ধরে। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কিছু এলাকা একাধিক প্রজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, আবার কিছু অঞ্চল নির্দিষ্ট মৌসুমে অস্থায়ী আশ্রয়স্থল। এই উদ্যোগ শুধু তথ্য সংগ্রহেই থেমে নেই। তারা এই বিশাল ডেটাসেটকে বিশ্লেষণ করে ব্যবহারযোগ্য তথ্যে পরিণত করছে। এখানেই এর প্রকৃত প্রভাব। কারণ এর থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তই সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এতগুলো সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করানো সহজ কাজ নয়। প্রত্যেকের লক্ষ্য ও কাজের নিজস্ব ধরণ থাকে। এই সমস্যা কাটাতে উদ্যোগটি নমনীয় পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। অংশগ্রহণকারীরা ঠিক করেন তাদের তথ্য কীভাবে ব্যবহার হবে এবং তারা পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকেন। এই পারস্পরিক আস্থা তথ্য বিনিময়কে তো সহজ করেই, উপরন্তু বিজ্ঞানী ও সংরক্ষণকর্মীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। ফলে তারা একসঙ্গে সমস্যার সমাধান খুঁজতে পারেন। যেমন, টেক্সাসে সংরক্ষণকারীরা জানতে চেয়েছিলেন কখন নির্দিষ্ট এলাকায় মিঠা জল সরবরাহ করা উচিত। কারণ পাখিরা নির্দিষ্ট সময়ে ঢেউয়ের মতো আসে। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে পুরো প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। উড়ান পথের উপাত্ত সেই সময় নির্ধারণে সাহায্য করেছে। আবার, সমুদ্রের ওপর বায়ুশক্তি প্রকল্পের ক্ষেত্রে পাখির উড়ানপথ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। অনুমানের বদলে উড়ান পথের উপাত্ত ব্যবহার করে প্রকৃত পথ জানা যায়, ফলে ঝুঁকি কমিয়ে উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই পরিবর্তন একটি নতুন চিন্তার দিক নির্দেশ করে। ক্ষতি হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া নয়, বরং আগেভাগে পরিকল্পনা। এই উদ্যোগ শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা এখন মানচিত্রে পাখির যাত্রাপথ অনুসরণ করতে পারে। এতে পাখি আর দূরের কোনো প্রাণী নয়, বরং বাস্তব, চলমান এক জীবন্ত সত্তা হয়ে ওঠে। এই সংযোগই সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝাতে সাহায্য করে। বর্তমানে এ কাজ মূলত উত্তর আমেরিকায় সীমাবদ্ধ হলেও পাখিদের যাত্রাপথ আর্কটিক থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলেও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

সূত্র : earth . com; March 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × three =