কৃবু নিয়ে ভুল ধারণা 

কৃবু নিয়ে ভুল ধারণা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ মার্চ, ২০২৬

ফরাসি-আমেরিকান কম্পিউটার বিজ্ঞানী লুক জুলিয়া তাঁর বই ‘দি এ আই ইলিউশান’-এ দাবি করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ আই নিয়ে আজকের পৃথিবীতে যে উত্তেজনা, ভয় ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তার অনেকটাই আসলে এক ধরনের বিভ্রম । দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যুক্তি দেন, এ আই -কে আমরা যতটা বুদ্ধিমান ভাবছি, বাস্তবে তা ততটা নয়; আসলে এ এক অত্যন্ত উন্নত তথ্য-প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি মাত্র।

এই ‘এ আই বিভ্রম’-এর মূল কারণ মানুষের চিন্তাধারা। আমাদের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা হল মেশিনকে মানুষের মতো ভাবা। ১৯৫৬ সালে এ আই গবেষণার শুরু থেকেই “ইন্টেলিজেন্স’’/ ’’বুদ্ধিমত্তা’’ শব্দটি নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। আমরা তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতাকে মানুষের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা বা অনুভূতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ও গণমাধ্যম এই ভ্রান্ত ধারণাকে আরও জোরদার করেছে। সেখানে এ আই -কে প্রায়ই মানবসদৃশ চেতনা ও আবেগসম্পন্ন সত্তা হিসেবে দেখানো হয়।

বাস্তবে এ আই কিন্তু মানুষের মতো চিন্তা করে না। এটি কেবল উপাত্ত ও অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট কাজ দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করে। একটি ক্যালকুলেটর দ্রুত হিসাব করতে পারে, তাহলে কি আমরা ক্যালকুলেটরকেও বুদ্ধিমান বলতে পারি? কখনোই নয়। ঠিক তেমনি এ আই -ও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে ভালো কর্মদক্ষ হলেও এর নিজস্ব কোনো চেতনা, অভিজ্ঞতা বা সৃজনশীলতা নেই। এ আই চাইলে সব জানে সবই পারে এই অতিরঞ্জিত ধারণা থেকেই মানুষ এ আই -কে নিয়ে অযথা ভয় পায় যে, এটি একদিন মানুষের জায়গা দখল করে নেবে।

এই ভ্রম কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যেই নয়, প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর মাধ্যমেও ছড়াচ্ছে। বড় বড় কোম্পানিগুলো এ আই -কে মানবসদৃশ বুদ্ধিমত্তার কাছাকাছি বলে প্রচার করে, কারণ এতে বিনিয়োগ বাড়ে ও বাজারে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করতে সুবিধা হয়। তবে অনেক বিজ্ঞানীই স্বীকার করেন যে এ আই আসলে একগুচ্ছ বিশেষায়িত টুল, কোনো একক ‘অমিত বুদ্ধিমান’ সত্তা মোটেই নয়।

কিন্তু এ আই -এর শক্তি অস্বীকার করা যায় না। বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি ও পরিবহনসহ নানা ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে। কিন্তু এর কার্যকারিতা নির্ভর করে উপাত্তের মান ও ব্যবহারের ওপর। ভুল উপাত্ত বা অপব্যবহার নিয়ে পক্ষপাত থেকে ত্রুটি ও নৈতিক সমস্যার জন্ম হতে পারে। তাই এক্ষেত্রে আজও মানুষের তত্ত্বাবধানের কোনো বিকল্প নেই।

লুক জুলিয়ার মতে, সত্যিকারের বুদ্ধিমান এ আই তখনই সম্ভব হবে, যখন তা মানুষের মতো বহুমাত্রিক চিন্তা, সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাবনের ক্ষমতা অর্জন করবে। বর্তমান এ আই দাবা খেলায় জিততে পারে, কিন্তু কবিতা লিখতে বা অনুভূতি বোঝাতে পারে না। তাই এ আই -কে মানুষের বিকল্প হিসেবে না দেখে বরং সহায়ক হিসেবে দেখাই বাস্তবসম্মত ও বাঞ্ছনীয়।

 

সূত্র: The intelligence illusion: why AI isn’t as smart as it is made out to be By David Adam, 23rd March 2026, published in Nature journal.

doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-00882-5

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + 12 =