ক্লোনিং প্রযুক্তির সীমা

ক্লোনিং প্রযুক্তির সীমা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২ এপ্রিল, ২০২৬

এক দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা। চলেছে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। অবশেষে ৫৮ প্রজন্ম এবং ৩০,০০০-এরও বেশি ক্লোনিং প্রচেষ্টার পর গবেষকরা দেখছেন, কোন একটি প্রাণীকে বারবার ক্লোন করার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। এক্ষেত্রে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন ইঁদুর। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অযৌন প্রজনন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। গবেষণায় তৈরি ক্লোন ইঁদুরগুলো দেখতে এবং আয়ুষ্কালের দিক থেকে স্বাভাবিক ইঁদুরের মতোই। কিন্তু তাদের জিনগত গঠনে (ডিএনএ) ধীরে ধীরে বড় ধরনের পরিবর্তন জমা হতে থাকে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আস্ত একটি ক্রোমোজোম হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও দেখা যায়। গবেষকদের মতে, এই ধরনের গুরুতর জিনগত পরিবর্তনই পরবর্তীতে ক্লোনিং প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। এই বিষয়ে মাইকেল লিঞ্চ বলেন, “এই ফলাফল সম্ভবত সব ধরনের মেরুদণ্ডী প্রাণীর ক্লোনিংয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য’’। অযৌন প্রজননের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি জিনগত বৈচিত্র্য তৈরি করতে পারে না। ফলে একবার কোনো ক্ষতিকর মিউটেশন ঢুকে গেলে, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম থেকে যায়। ইঁদুর ক্লোনিংয়ের ইতিহাসের শুরু ১৯৯৭ সালে, যখন তেরুহিকো ওয়াকায়ামা প্রথম সফলভাবে একটি ক্লোন ইঁদুর তৈরি করেন। তিনি একটি পূর্ণবয়স্ক ইঁদুরের দেহকোষ থেকে নিউক্লিয়াস নিয়ে সেটি একটি ভ্রূণের কোষে প্রতিস্থাপন করেন। ক্লোনিং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এরপর থেকে তিনি ও তাঁর দল বিভিন্ন অস্বাভাবিক উৎস থেকেও ইঁদুর ক্লোন করার চেষ্টা করেন। যেমন মৃত ইঁদুর, বহু বছর ধরে সংরক্ষিত নমুনা, এমনকি হিমায়িত কোষ বা প্রস্রাব থেকেও। তাঁদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল প্রাণীদের জিনগত সম্পদ দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা। এই ধারাবাহিক গবেষণার অংশ হিসেবে তেরুহিকো ওয়াকায়ামা এবং সায়াকা ওয়াকায়ামা একটি পরীক্ষা শুরু করেন। কেবল ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে কত প্রজন্ম পর্যন্ত একটি ইঁদুরের বংশধারা বজায় রাখা সম্ভব। ২০১৩ সালে তাঁরা ২৫ প্রজন্মের সফলতার কথা জানান। তাতে তাঁরা মনে করেছিলেন, হয়তো এই প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল চালানো সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে সমস্যা শুরু হয় ২৭তম প্রজন্মের পর থেকেই। ধীরে ধীরে ক্লোন তৈরি করা কঠিন হয়ে ওঠে। অবশেষে ৫৮তম প্রজন্মে এসে ক্লোনিং পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। আর নতুন কোনো ক্লোন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। গবেষকেরা সম্ভাব্য কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখেন, শুধু ডিএনএ-এর রাসায়নিক পরিবর্তন নয়, বরং ডিএনএ-এর গঠনগত পরিবর্তনই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে। ক্লোন করা ইঁদুরগুলোর মধ্যে মিউটেশনের হার স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি ছিল। পরবর্তী প্রজন্মগুলোতে বড় আকারের জিনগত পরিবর্তন, যেমন ক্রোমোজোমের অংশ হারিয়ে যাওয়া, উল্টে যাওয়া বা স্থান পরিবর্তন ক্রমশ বাড়তে থাকে। এমনকি একটি গোটা X ক্রোমোজোম লোপাট হয়ে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। আতসুও ওগুরা এই গবেষণাকে প্রথম পরীক্ষামূলক প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। এ থেকে দেখা যায় যে স্তন্যপায়ী প্রাণীতে অযৌন প্রজনন চালিয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত মিউটেশন জমে বংশধারা থেমে যায়। এই আবিষ্কার কৃষি ও পশুপালনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে উন্নত জাতের পশু সংরক্ষণের জন্য ক্লোনিং ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবতে হবে। গবেষকদের পরামর্শ, একই প্রাণীকে বারবার ক্লোন করার পরিবর্তে, আগে থেকেই তার দেহকোষ সংরক্ষণ করে রাখা বেশি নিরাপদ ও প্রয়োজনীয়। সুতরাং ক্লোনিং প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, প্রকৃতির মৌলিক জিনগত সীমাবদ্ধতাকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

সূত্র: Nature, March, 26

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 − 7 =