তুষারযুগেও শ্যামল মণিপুর

তুষারযুগেও শ্যামল মণিপুর

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ এপ্রিল, ২০২৬

সম্প্রতি মণিপুরের পাহাড়ি ভূ-ভাগের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোটি বছরের পুরোনো পাম গাছের পাতার জীবাশ্ম উত্তর-পূর্ব ভারতের জলবায়ুর এক ভিন্ন ইতিহাস তুলে ধরছে। সাধারণভাবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পাম গাছের জীবাশ্ম উষ্ণ ও আর্দ্র ক্রান্তীয় জলবায়ুর নির্ভরযোগ্য সূচক। কারণ এই গাছগুলি সাধারণত উচ্চ তাপমাত্রা, প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং তুষারবিহীন পরিবেশে জন্মায়। তাই মণিপুরে পাওয়া পাম পাতার জীবাশ্ম প্রমাণ করে যে প্রায় ৩ কোটি বছর আগে এই অঞ্চল ছিল ঘন সবুজ, উষ্ণ ও আর্দ্র অরণ্যে আচ্ছাদিত।

এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অফ দ্য বোটানিক্যাল সোসাইটি অফ বেঙ্গল। যেখানে বীরবল সাহানি ইন্সটিটিউট অফ প্যালিওসায়েন্সেসের গবেষক হর্ষিতা ভাটিয়া ও গৌরব শ্রীবাস্তব মণিপুরের থৌবাল ও সেনাপতি জেলার লেইসঙ ফরমেশন থেকে সংগৃহীত উদ্ভিদ জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করেছেন। এসব জীবাশ্ম মূলত দ্বিবীজপত্রী পাম পাতার অংশ, যা পরবর্তী ইওসিন যুগ থেকে প্রারম্ভিক অলিগোসিন যুগের (প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর আগে) সময়কালের বলে নির্ধারিত হয়েছে।

পাম গাছের উপস্থিতি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই গাছ কেবলমাত্র উষ্ণ, আর্দ্র এবং তুষারমুক্ত পরিবেশেই টিকে থাকতে পারে। ফলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, সেই সময় মণিপুরে ছিল এক স্থায়ী উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু। হিসাব অনুযায়ী, তখন গড় তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি, আর বার্ষিক বৃষ্টিপাত ছিল প্রায় ২৪৪ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ বর্তমান উষ্ণ-আর্দ্র মৌসুমি জলবায়ুর মতো পরিবেশই তখন বিরাজমান ছিল। পাশাপাশি, বৃষ্টিপাতের একটি মৌসুমি ধরণও ছিল। গ্রীষ্মে ভারী বর্ষণ এবং শীতে তুলনামূলক শুষ্কতা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই সময়টি পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বড় জলবায়ু পরিবর্তনের পর্যায়। যাকে বলা হয় ইওসিন-অলিগোসিন ট্রানজিশান। সেসময়ই অ্যান্টার্কটিকায় বরফস্তর বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্বব্যাপী শীতলতা বাড়ে। বিশ্বের অনেক অংশে তখন ক্রান্তীয় বনভূমি বিলুপ্তির পথে। অথচ সেই কঠিন সময়েও মণিপুরে উষ্ণ ও আর্দ্র ক্রান্তীয় অরণ্য টিকে ছিল অবিচলভাবে।

এই ব্যতিক্রমী স্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে গবেষকরা তুলে ধরছেন “ক্লাইমেটিক রিফিউজিয়াম’’-এর ধারণা। অর্থাৎ এমন একটি অঞ্চল, যা বৈশ্বিক পরিবর্তনের মধ্যেও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকে। মণিপুর এবং বৃহত্তর উত্তর-পূর্ব ভারত সম্ভবত সেই ধরনেরই এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল।

জীবাশ্মগুলির ভূ-তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট আরও একটি জীবন্ত দৃশ্যপট তুলে ধরেছে। জীবাশ্মগুলি যে শিলাস্তর থেকে পাওয়া গেছে, তা উপকূলীয় ও বদ্বীপীয় পরিবেশে গঠিত। এর অর্থ, সেই সময় মণিপুরে নদী, জলাভূমি, উপকূল এবং ঘন অরণ্যের সমন্বয়ে একটি বৈচিত্র্যময় ভূ-দৃশ্য ছিল।

এই আবিষ্কার শুধু অতীতের জলবায়ু নয়, ভারতের বর্তমান মৌসুমি জলবায়ু ব্যবস্থার প্রাথমিক বিকাশ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। আশেপাশের নাগাল্যান্ডের জীবাশ্মের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর আগেই মৌসুমি বৃষ্টিপাতের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল।

এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে উত্তর-পূর্ব ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ বজায় ছিল। এই দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতাই হয়তো আজকের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ।

 

সূত্র: How fossils of Manipur challenge our idea of climate stability by Roopak Goswami, 24th March 2026, published in ‘Journal of the Botanical Society of Bengal’.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 − eleven =