১৯৮৯ সালের ৭ এপ্রিল, ঠান্ডা উত্তর আটলান্টিকের জলে নরওয়ের বেয়ার আইল্যান্ডের কাছে নিঃশব্দে চলছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ K-278 কমসোমোলেতস। সাবমেরিনটিতে ছিল দুটি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র। হঠাৎই একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি বড় দুর্ঘটনার সূচনা করে। ইঞ্জিনিয়ারিং অংশে একটি শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগে। সেই আগুন দ্রুত ডুবোজাহাজের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারগুলিকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে আগুন আরও তীব্র হয়। ধীরে ধীরে ডুবোজাহাজের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নাবিক সদস্যরা পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বন্ধ করে জাহাজ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত ডুবোজাহাজটি সমুদ্রের প্রায় ৫,৫০০ ফুট গভীরে তলিয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর, এই ডুবে থাকা সাবমেরিনের অবস্থা জানতে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়। ২০১৯ সালে নরওয়ের রেডিয়েশন ও নিউক্লিয়ার সেফটি অথরিটির বিজ্ঞানী জাস্টিন গুইন এবং ইনস্টিটিউট অব মেরিন রিসার্চ-এর গবেষকরা একটি সমীক্ষা চালান। তারা রিমোট কন্ট্রোল চালিত গভীর সমুদ্রযান ব্যবহার করে সাবমেরিনটির ধ্বংসাবশেষের ভিডিও করেন। তাছাড়াও আশপাশের জল, সামুদ্রিক প্রাণী ও তলদেশের পলি থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। এসব নমুনা বিশ্লেষণ করে তারা তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা নির্ণয় করেন। গবেষণায় দেখা যায়, সাবমেরিনের সামনের অংশটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে টর্পেডো প্রকোষ্ঠ, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র রাখা ছিল, তা সরাসরি সমুদ্রজলের সংস্পর্শে চলে আসে। তবে একটি স্বস্তির বিষয়, গবেষকরা প্লুটোনিয়াম লিক হওয়ার কোনো প্রমাণ পাননি। প্রায় ৩০ বছর আগে রাশিয়া সরকার যে টাইটানিয়াম প্লেট বসিয়েছিল, তা এখনও কার্যকর। ফলত জল ঢোকা অনেকটাই রোধ করছে। তবে সাবমেরিনের পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের অবস্থা কিছুটা উদ্বেগজনক। একটি ভেন্টিলেশন পাইপের কাছ থেকে নেওয়া নমুনায় তেজস্ক্রিয় পদার্থের অনিয়মিত নির্গমন ধরা পড়েছে। বিশেষ করে পারমাণবিক বিভাজন জাত স্ট্রনশিয়াম ও সিজিয়ামের। দেখা গেছে, এই দুই আইসোটোপের মাত্রা স্বাভাবিক সমুদ্রজলের তুলনায় যথাক্রমে প্রায় ৪ লক্ষ এবং ৮ লক্ষ গুণ বেশি। এছাড়াও স্পঞ্জ, প্রবাল এবং ‘সি অ্যানিমোনি’-র মতো সামুদ্রিক জীবের শরীরেও উচ্চমাত্রায় তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম জমা হয়েছে। তেজস্ক্রিয় পদার্থ যে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের মধ্যে প্রবেশ করছে, এ তারই ইঙ্গিত। গবেষকদের মতে, প্লুটোনিয়াম ও ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায় রিঅ্যাক্টরের পারমাণবিক জ্বালানি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত বড় ধরনের বিপদ দেখা যায়নি। কারণ, তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সাবমেরিনের কাছাকাছি এলাকায় বেশি হলেও অল্প দূরেই তা দ্রুত কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ, সমুদ্রের বিশাল জলের ভর এই তেজস্ক্রিয়তাকে দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে পাতলা করে দিচ্ছে। তলদেশের পলির নমুনাতেও অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তার কোনো উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে আপাতত পরিবেশগত ক্ষতি সীমিত বলেই মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ডুবে যাওয়া একটি পারমাণবিক সাবমেরিনের পক্ষে এটিকে তুলনামূলকভাবে ‘নিয়ন্ত্রিত’ পরিস্থিতি বলা যেতে পারে। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। রিঅ্যাক্টরের ক্ষয় যত বাড়বে, ততই তেজস্ক্রিয় পদার্থ ধীরে ধীরে সমুদ্রে ছড়াতে থাকবে। তাই এই সাবমেরিনকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র: Science; March, 2026
