প্রাচীন কেরালার জগদ্বিখ্যাত গণিত ঘরানা-১ 

প্রাচীন কেরালার জগদ্বিখ্যাত গণিত ঘরানা-১ 

জর্জ গেভার্গিজ জোসেফ
Posted on ৩ এপ্রিল, ২০২৬

জর্জ গেভার্গিজ জোসে

[গণিতের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ জর্জ গেভার্গিজ জোসেফ-এর জন্ম কেরালায়। ইংল্যাডের লিস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে ম্যাঞ্চেস্টার ও টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আর্যভট রচিত ‘আর্যভটীয়’-র ১৫০০ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সেমিনারের এক উদ্যোক্তা। তাঁর The Crest of the Peacock: Non-European Roots of Mathematics (1991) বইটি সুপরিচিত।]

 

মাধব

কেরালার গণিত ঘরানার উদ্ভব ঘটেছিল চোদ্দো শতকের প্রথম কয়েক দশকে। ওই সময়েই এই ঘরানার পত্তনকার সঙ্গমাগ্রম মাধব (আনুমানিক ১৩৪০-১৪২৫)-এর আবির্ভাব। শুরু হল এক গুরু-শিষ্য পরম্পরা, যা দুশো বছরেরও বেশি সময় ধরে কেরালা ঘরানার বিভিন্ন সদস্যকে নিয়ে আলোচনার এক উল্লেখ-বিন্দু।

ব্যক্তি মাধব সম্পর্কে অল্পই জানা যায়। তিনি এম্প্রান্তিরি নামক এক ব্রাহ্মণ পুরোহিত শ্রেণির মানুষ। এঁরা অল্পকাল আগে কর্নাটকের উপকূল অঞ্চল থেকে এসে কেরালার ব্রাহ্মণ জাতির এক উপবিভাগ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর রচিত ‘ভেনভারোহ’-র যে-ভাষ্য লিখেছিলেন অচ্যুত পিসারোথি (জন্ম- ১৫৫০) তা থেকে এবং নীলকণ্ঠ (জন্ম- ১৪৪৩) রচিত ‘আর্যভটীয়-ভাষ্য’ থেকে মাধবের বংশধারা ও গ্রাম সম্বন্ধে কিছু তথ্য পাই। তা থেকে জানা যায়, মধ্য কেরালার সঙ্গমাগ্রম গ্রামে মাধব-এর জন্ম। তাঁর ঘরের নাম ছিল সংস্কৃতে বকুলাধিস্তিতবিহারম, মলয়ালমে ইলাইনিন্নাপল্লী। ওই গ্রামে প্রভু সঙ্গমাগ্রম-এর একটি মন্দির ছিল, তা থেকেই এই নাম। এ জায়গাটি বর্তমান ত্রিসুর-এর কাছে অবস্থিত, নাম ইরিঞ্জিন্নাপল্লী। মাধব-এর ইলাইনিন্নাপল্লী-কে আজকের দিনের কাল্লেট্টুংকর রেল স্টেশন থেকে কিলোমিটার আষ্টেক দূরে দুটি নাম্বুথিরি গৃহর একটি বলে চিহ্নিত করা গেছে – ইরিয়ারাপল্লী আর ইরিয়ারাবল্লী।

মাধব-এর যে-কটি রচনা টিকে আছে সেগুলি সবই জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত। সেগুলির উদ্দেশ্য মূলত বররুচির সহজে মনে রাখার উপযোগী ‘বাক্য’প্রণালীর পরিশীলন। ‘ভেনবরোহ’ আর ‘স্ফুটচন্দ্রপতি’ দুটি বইয়েই মাধব ‘চন্দ্রবাক্য’-র সংশোধন করেছেন। চাঁদের একেবারে নিখুঁত অবস্থান সেকেন্ডের মাপে গণনা করেছেন, যা দিবসের ৩৬ মিনিট পর্যন্ত নির্ভুল। এর আগে বররুচির ‘চন্দ্রবাক্য’গুলো থেকে কেবল মিনিটের হিসেবে নিখুঁতভাবে গণনা করা যেত। চান্দ্র বাক্যগুলোর চক্রাকার চরিত্র অনুযায়ী ন-টি অসম মাস মিলিয়ে হয় ২৪৮ দিন। সেই চক্র কাজে লাগিয়ে মাধব একটি দিনে সমদূরত্বের ন-টি সময়কালে চাঁদের দ্রাঘিমা নির্ণয় করেন। গ্রহদের দ্রাঘিমা আর লগ্ন গণনা বিষয়েও আলোচনা করেন। এগুলি ছাড়া নীলকণ্ঠ, জ্যেষ্ঠদেব, শঙ্কর বরিহার প্রমুখ উত্তরসূরিদের দ্বারা উদ্ধৃত কিছু কিছু শ্লোক থেকে কেরালা ঘরানার গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে মাধবের মৌলিক অবদানের খবর পাই। তাঁর খ্যাতির মূলে আছে বৃত্ত আর ত্রিকোণমিতিক ফাংশনের অসীম সিরিজ আবিষ্কার। এটি সচরাচর আর্কট্যানজেন্টের (ট্যানজেন্ট ফাংশনের বিপরীত ফাংশন ) গ্রেগরি সিরিজ নামে পরিচিত। এছাড়া পাই-এর (π ) লাইবনিজ সিরিজ এবং সাইন আর কোসাইনের নিউটন পাওয়ার সিরিজ প্রসারণের ১/৩৬০০ ভাগ (আধুনিক মানে) পর্যন্ত নিখুঁত গণনার জন্য তিনি প্রসিদ্ধ। এ বাদেও আছে কতকগুলি চমৎকার আসন্নায়ন।

 

পরমেশ্বর

বটাশ্বেরি পরমেশ্বর ছিলেন মাধবের বিশিষ্ট শিষ্য। বটাশ্বেরি নামক নাম্বুথিরি ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম আলাথিয়ুর-এ, ১৩৬০ সালে। পরিবারটি জ্যোতির্বিজ্ঞান আর ফলিত জ্যোতিষ চর্চার জন্য প্রসিদ্ধ। জায়গাটি আজকের দিনের আলাথিয়ুর পালঘাট জেলার দক্ষিণ মালাবারের পোন্নানি তালুকে অবস্থিত। তাঁর ‘গোলদীপিকা’ গ্রন্থে এই গ্রামের উল্লেখ আছে। তাঁর পিতামাতার খবর খুব বেশি পাওয়া যায় না; কিন্তু গোবিন্দর ‘মুহূর্তরত্ন’-র যে-ভাষ্য তিনি রচনা করেছিলেন তা থেকে এবং ‘আকরসংগ্রহ’ নামক তাঁর ফলিত জ্যোতিষ বিষয়ক রচনা থেকে তাঁর পিতামহর খবর পাওয়া যায়। পিতামহ ছিলেন এক সুপরিচিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গোবিন্দ ভট্টথিরির শিষ্য।

পরমেশ্বরের পুত্র বটাশ্বেরি দামোদর ছিলেন এক প্রভাবশালী শিক্ষক। কেরালা ঘরানার দুই প্রধান চরিত্র নীলকণ্ঠ আর জ্যেষ্ঠদেব এঁরই শিষ্য।

নীলকণ্ঠের মতে পরমেশ্বর গণিত শিক্ষা করেছিলেন মাধব-এর কাছে। তিনি অনেকগুলি ভাষ্য রচনা করেছিলেন। যথা, আর্যভটর ‘আর্যভটীয়’, ভাস্কর-১-এর ‘মহাভাস্করীয়’ও ‘লঘুভাস্করীয়’, গোবিন্দস্বামীর ‘মহাভাস্করীয়’-র ভাষ্য, মঞ্জুল-এর ‘লঘুমীমাংসা’ এবং ভাস্করাচার্যর ‘লীলাবতী’। ভারতের জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের এইসব প্রধান প্রধান রচনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিচার করে তার বিষয়গুলিকে ছড়িয়ে দেওয়ার মূলে পরমেশ্বরের ভূমিকা অপরিসীম। এরই ফলে পরমেশ্বরের পথ ধরে যাঁরা এলেন তাঁরা হাতের সামনে এই জ্ঞানের সমগ্র ভাণ্ডারটি তৈরি অবস্থায় পেয়ে গেলেন। দক্ষিণ ভারতে গ্রহ-জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশে পরমেশ্বরের প্রধান অবদান তাঁর দৃগ্‌গণিত প্রণালী। ১৪৩২ সালের রচনায় তিনি এটি ব্যাখ্যা করেছিলেন। এতে তিনি পর্যবেক্ষণের নিরিখে তত্ত্বগুলিকে যাচিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। নামেই তার প্রমাণ: দৃগ অর্থ দেখা আর গণিত অর্থ গণিতের তত্ত্বাদি কিংবা গণনা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই বইটি দুভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে রয়েছে গ্রহকেন্দ্রগুলির গড় অবস্থান আর সমীকরণের গণনা, সেগুলির সংশোধন এবং সাইন থেকে তাদের চাপ গণনার পদ্ধতি। দ্বিতীয় ভাগে কেবল কাটাপয়াদি সংকেতে প্রথম ভাগের সারসংক্ষেপ পেশ করা হয়েছে। সম্ভবত এই প্রথম ভারতে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি গাণিতিক মডেল রচিত হল। এ ছাড়াও তিনি লিখেছিলেন ‘গোলদীপিকা’। এতে গোলীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। এর দুটি ভাষ্য আছে। দুটি ভাষ্য মিলে সূর্যঘড়ির ছায়াদৈর্ঘ্য মেপে সময় গণনা, লম্বন, ভূ-সাপেক্ষে জ্যোতিষ্কর চলন নির্দেশক গোলক (আর্মিলারি) নির্মাণ, গ্রহদের প্রকৃত ও আপাত চলন, পৃথিবীর পরিধি মাপার বিবিধ পদ্ধতি এবং আরও অনেক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছিল।

১৩৯৩ থেকে ১৪৩২-এর মধ্যে পরমেশ্বর নিকটবর্তী এক সাগর উপকূল থেকে একাদিক্রমে সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের ওপর একপ্রস্থ পর্যবেক্ষণ চালিয়ে সেগুলির খতিয়ান লেখেন। শোনা যায় এই কাজের দরুন তিনি একঘরে হয়ে যান। ফলে এইসব পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি সাগর উপকূলের নিম্নজাতির জেলেদের মধ্যে গিয়ে বাস করতে বাধ্য হন। এ কিংবদন্তির সত্যতা যাচাই করা কঠিন। যেটুকু জানা যায় তা হল, তিনি ফলিত জ্যোতিষ বিষয়ে প্রচুর লিখেছিলেন। যেমন আগেই উল্লেখিত গোবিন্দর ‘মুহূর্তরত্ন’-র গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্যটি। (চলবে)

 

[অনুবাদ: আশীষ লাহিড়ী]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × four =