ভয়েজার-এর কেরামতি 

ভয়েজার-এর কেরামতি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ এপ্রিল, ২০২৬

ভয়েজার অভিযান মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্ময়কর মিশনগুলোর মধ্যে অন্যতম । ১৯৭৭ সালে দুটি মহাকাশযানকে উৎক্ষেপণ করা হয় : ভয়েজার ১ এবং ভয়েজার ২। এই দুটি সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে অজানা মহাকাশের তথ্য পাঠিয়ে চলেছে আজও। সূর্যের চারপাশে একটি বিশাল সুরক্ষাদায়ী বুদবুদ রয়েছে- হেলিওস্ফিয়ার। এটি মূলত সূর্য থেকে নির্গত চার্জযুক্ত কণার প্রবাহ বা সৌর বায়ু দ্বারা তৈরি। বহু বছর ধরে এই বুদবুদের ভেতরেই ছিল ভয়েজার দুটি। তবে ২০১২ সালে ভয়েজার ১ এবং ২০১৮ সালে ভয়েজার ২ সেই সীমাও অতিক্রম করে চলে যায় সৌরজগতের বাইরে। বর্তমানে, পৃথিবী থেকে প্রায় ২১ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে, ভয়েজার ২ অবস্থান করছে এবং ‘টেলিস্কোপিয়াম’ নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে এগোচ্ছে। অন্যদিকে ভয়েজার ১ পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে রয়েছে। যা এক “আলোক দিবস’’ বা আলোর এক দিনের ভ্রমণের দূরত্বের সমান। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের নভেম্বর নাগাদ এটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করবে।

দুটি মহাকাশযানের বিশেষত্ব শুধু তাদের দূরত্বেই নয়, বরং তাদের দীর্ঘস্থায়ী কার্যক্ষমতাতেও নিহিত রয়েছে। উৎক্ষেপণের প্রায় পাঁচ দশক পরেও তারা সক্রিয় রয়েছে এবং নিয়মিত তথ্য পাঠাচ্ছে। তবে শক্তি সাশ্রয়ের জন্য প্রকৌশলীরা ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্র বন্ধ করে দিচ্ছেন, যাতে ২০৩০ পর্যন্ত অন্তত কিছু বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া যায়। ভয়েজার ১ যখন সৌরজগতের সীমানায় পৌঁছায়, তখন এটি প্রবেশ করে একটি বিশেষ অঞ্চলে, যার নাম ‘হেলিওপজ’। এখানে সৌর বায়ু এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাজাগতিক কণাগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে, ফলে একটি অশান্ত ও শক্তিশালী প্লাজমা অঞ্চল তৈরি হয়। এই অঞ্চলের তাপমাত্রা প্রায় ৯০,০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এত তাপমাত্রা সত্ত্বেও এখানে আমাদের পরিচিত অর্থে “গরম’’মনে হবে না। কারণ, কণাগুলির ঘনত্ব অত্যন্ত কম। অর্থাৎ খুব অল্প সংখ্যক কণা-ই এখানে উপস্থিত থাকে। ফলে তাপ অনুভব করার মতো পর্যাপ্ত শক্তি পরিবাহিত হয় না। হেলিওপজ আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সীমানা হিসেবেও কাজ করে। এটি বাইরের মহাজাগতিক বিকিরণের একটি বড় অংশকে আটকে দেয়, ফলে সৌরজগতের গ্রহগুলোর পরিবেশ কিছুটা সুরক্ষিত থাকে।

বর্তমানে পৃথিবী থেকে ১৫ বিলিয়ন মাইলেরও বেশি দূরে থাকা ভয়েজার ১ এখনও নিয়মিত তথ্য পাঠাচ্ছে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের বাইরে মহাকাশের গঠন, প্লাজমার আচরণ এবং সীমান্ত অঞ্চলের জটিল প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন নতুন ধারণা পাচ্ছেন। এই অভিযানের তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, আমাদের সৌরজগতের সীমানাটা কোনো স্থির বা সরল রেখা নয়। বরং এটি অত্যন্ত গতিশীল ও জটিল অঞ্চল। ভয়েজার মহাকাশযান দুটি তাই শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যের প্রতীক নয়, বরং মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করার এক অমূল্য মাধ্যম।

 

সূত্র : Source: Stone et al., Science (Voyager 1 cosmic ray observations)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × one =