পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক অভাবনীয় আবিষ্কার নতুন করে বিস্মিত করেছে বিজ্ঞানীদের। আলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকা কিছু অদ্ভুত গঠন, যেগুলোকে গবেষকরা “ডার্ক হোল’’ বলে উল্লেখ করছেন, তারা নাকি ক্ষণকালের জন্য আলোর গতিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। শুনতে অবিশ্বাস্য এই ঘটনায় প্রকৃতির নিয়ম কিন্তু কোনোভাবেই লঙ্ঘিত হয় না।
এই “ডার্ক হোল’’ আসলে কোনো মহাকাশীয় ব্ল্যাক হোল নয়। এগুলোকে বলা হয় অপটিক্যাল ভর্টেক্স বা ফেজ সিঙ্গুলারিটি। আলোক তরঙ্গের এমন বিন্দুসদৃশ অঞ্চল, যেখানে আলো একেবারে নিঃশেষ হয়ে গিয়ে চারপাশে ঘূর্ণায়মান তরঙ্গের জটিল নকশা তৈরি করে। অনেকটা ঘূর্ণিজলের মাঝখানের ফাঁপা অংশটির মতো, যেখানে কেন্দ্রটি অন্ধকার আর চারপাশে ঘূর্ণি।
বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই মনে করতেন, এই ভর্টেক্স বা ঘূর্ণিগুলো তরঙ্গের ভেতরে এমনভাবে চলতে পারে, যা আলোর গতির চেয়েও দ্রুত হতে পারে। এবার সেই ধারণাই বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই গঠনগুলো কিন্তু কোনো বস্তু নয়, এগুলোর কোনো ভর, শক্তি বা তথ্য বহন করার ক্ষমতা নেই। তাই এদের এই দ্রুতগতি আসলে তরঙ্গের আকার বা গঠনের পরিবর্তনের ফল, কোনো বাস্তব কণার চলাচল নয়। ফলে এখানে আলবার্ট আইনস্টাইন-এর আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব অটুট থাকে।
এই যুগান্তকারী গবেষণার নেতৃত্ব দেন ইদো কামিনার, যিনি ইসরায়েল ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির একজন পদার্থবিদ। তার দল ছয় -কোণা (হেক্সাগোনাল) বোরন নাইট্রাইড নামক একটি বিশেষ পদার্থ ব্যবহার করে আলোকে ধীরগতি করে এমন এক অবস্থায় নিয়ে আসে, যেখানে আলো ও পদার্থের মিশ্র তরঙ্গ তৈরি হয়, তাকে বলা হয় ‘ফোনন পোলারিটন’। এই কৌশলেই আলোর সূক্ষ্ম গঠনগুলো স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব হয়।
ঘটনাটি পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে অত্যাধুনিক উচ্চগতি ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ, যা সেকেন্ডের এক কোয়াড্রিলিয়ন ভাগ সময়ের পরিবর্তনও ধরে ফেলতে পারে। আলাদা আলাদা সময়ে তোলা শত শত ছবি একত্র করে তারা একটি টাইম-ল্যাপস তৈরি করেন। সেখানে দেখা যায় সেই ঘূর্নিগুলো একে অপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, মুহূর্তের জন্য আলোর গতির চেয়েও দ্রুত হচ্ছে, তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে।
এই আবিষ্কার শুধু আলোর ক্ষেত্রেই নয়, সব ধরনের তরঙ্গ যেমন, শব্দ বা অন্যান্য পদার্থগত তরঙ্গ সম্পর্কে আমাদের ধারণা বাড়ায়। এটি ভবিষ্যতে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের অতিদ্রুত প্রক্রিয়া বিশ্লেষণের জন্য নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতির পথ দেখাতে পারে।
সূত্র: Nature (2026)
