সারা বিশ্বের নজর এখন নাসা’র আর্টেমিস-২ অভিযানের দিকে। চারজন মহাকাশচারীকে চাঁদের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। মিশনটি চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে আসবে। সংস্থাটির লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে আবারও মানুষকে চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করানো। তবে প্রতিযোগিতায় চীন-ও দ্রুত এগিয়ে আসছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথমবার চীনা মহাকাশচারীরা চাঁদের মাটিতে পা রাখবেন- এই হল তাঁদের পরিকল্পনা। চীনের এই অভিযানে ব্যবহৃত হবে ‘মেংঝৌ’ নামক এক মহাকাশযান। এই নামের অর্থ ‘স্বপ্নযান’। এটি উৎক্ষেপণ করা হবে লং মার্চ ১০ রকেটের মাধ্যমে। একই সঙ্গে আরেকটি রকেট চাঁদের ‘ল্যান্ডার লানইউয়ে’ বহন করবে। যার অর্থ ‘চাঁদকে আলিঙ্গন করা’। ল্যান্ডারটি চাঁদের কক্ষপথে গিয়ে মেংঝৌ-এর সঙ্গে যুক্ত হবে। মেংঝৌ মহাকাশযানটি আকারে অনেকটা ওরিয়ন ক্যাপসুলের মতো। এটি নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথে সর্বোচ্চ সাতজন মহাকাশচারী বহন করতে পারলেও, চাঁদের অভিযানে তিনজনকে নিয়ে যেতে পারবে। চীনের মানব মহাকাশ অভিযান সংস্থা ইতিমধ্যেই মেংঝৌ-এর প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছে, যদিও সেখানে কোনো মানুষ ছিল না। এই পরীক্ষায় মহাকাশযানের জরুরি বিচ্ছিন্নকরণ ব্যবস্থা সফল হতে দেখা গেছে। এছাড়া, চলতি বছরের মধ্যেই একটি মানববিহীন মেংঝৌ মহাকাশযানকে তিয়ানগং স্পেস স্টেশন-এ পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রকল্পটি প্রায় প্রস্তুত অবস্থাতেই রয়েছে। যদিও চাঁদে অবতরণের আগে আরও কিছু পরীক্ষা চালানো হবে।
অন্যদিকে, নাসা প্রথমে ২০২৪ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির অভাবে তা পিছিয়ে যায়। বিশেষ করে ল্যান্ডার স্টারশিপ এবং ব্লু মুন এখনও উন্নয়ন পর্যায়-তেই রয়েছে। ফলে ২০২৮ সালের সময়সীমা আরও পিছিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা। যদি এমনটা হয়, তাহলে ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭-এর পর প্রথমবার চাঁদের মাটিতে নামার ক্ষেত্রে চীন এগিয়ে যেতে পারে। কারণ, অনেকেই মনে করেন, চীন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট দক্ষ। চীন ইতিমধ্যেই ২০০৭ সাল থেকে একাধিক রোবোটিক মিশন পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালে চাঁদের অ-দেখা অংশে অবতরণ, ২০২০ সালে প্রথম নমুনা সংগ্রহ এবং ২০২৪ সালে সেই অ-দেখা অংশ থেকেও নমুনা আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য রয়েছে। প্রথম মানব অবতরণের জন্য চীন সম্ভবত চাঁদের বিষুবরেখার কাছাকাছি সমতল অঞ্চল বেছে নেবে, যেখানে অবতরণ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। সম্ভাব্য স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে ‘রিমাই বোডে’ নামক একটি প্রাচীন আগ্নেয়গিরি অঞ্চল। বিজ্ঞানীদের মতে, জায়গাটি চাঁদের গভীর অভ্যন্তরের উপাদান এবং প্রাচীন আঘাতের চিহ্ন বহন করে, যা চাঁদ ও পৃথিবীর গঠন ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন- উভয় দেশই চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে ঘাঁটি স্থাপন করতে চায়। কারণ সেখানে বরফ আকারে জল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই জল ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করা গেলে, সেটিকে রকেটের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। চীন ও রাশিয়া মিলে ২০৩০-এর দশকে ‘ইন্টারন্যাশনাল লুনার রিসার্চ স্টেশন’ নামে একটি স্থায়ী চান্দ্র ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা করছে। এর লক্ষ্য হবে চাঁদের ভূতত্ত্ব অধ্যয়ন এবং মহাকাশ গবেষণা এগিয়ে নেওয়া। তবে পুরো বিষয়টিকে অনেকেই সরাসরি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলেও, কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন চীনের লক্ষ্য শুধু ‘প্রথম’ হওয়াই নয়, দীর্ঘমেয়াদে চাঁদে স্থায়ী উপস্থিতি তৈরি করাও। তাদের কাছে চাঁদ একটি কৌশলগত ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থান। সুতরাং চাঁদে আবার পা রাখার এই উদ্যোগ একদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
সূত্র: Nature, March, 2026
