‘উইনস্টন রেড’ হীরে  

‘উইনস্টন রেড’ হীরে  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৯ এপ্রিল, ২০২৬

দেখতে যেন জ্বলজ্বলে লাল রুবি। কিন্তু আসলে এটি একটি হীরে। ২.৩৩ ক্যারাট ওজনের “উইনস্টন রেড ডায়মন্ড” পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল হীরেগুলোর মধ্যে একটি। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে বর্তমানে এটি প্রদর্শিত হচ্ছে, বিখ্যাত ‘হোপ ডায়মন্ডের’ কাছেই। বিরল হীরেটির প্রকৃতি ও ইতিহাস জানার জন্য স্মিথসোনিয়ানের রত্ন ও খনিজ বিশেষজ্ঞ গ্যাব্রিয়েলা ফারফান এবং তাঁর সহকর্মীরা প্রায় দু বছর ধরে এটিকে নিয়ে গবেষণা চালান। গবেষণায় তারা হীরেটিকে শ্রেণিবদ্ধ করেন এবং এর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে ভেনেজুয়েলা বা ব্রাজিলকে চিহ্নিত করেন। কারণ এ সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে এর খনিজ বৈশিষ্ট্য এবং পুরনো কাটের ধরন দেখে গবেষকরা মনে করছেন, সম্ভবত ভেনেজুয়েলা বা ব্রাজিলের কোনো খনি থেকে এটি এসেছে। ২০২৩ সালে রোনাল্ড উইনস্টন, স্মিথসোনিয়ানকে এই হীরেটি দান করেন। উইনস্টন একজন বিখ্যাত আমেরিকান জহুরী হ্যারি উইনস্টনের ছেলে। প্রায় ৮ মিলিমিটার ব্যাসের এই হীরেটি বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম লাল হীরে। বিশ্বের বৃহত্তম লাল হীরে হলো ‘মুসাইয়েফ রেড’, যার ওজন ৫.১১ ক্যারাট। উইনস্টন রেড ডায়মন্ডের কাট বা গড়নের ধরন দেখে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি সম্ভবত বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের আগেই খনন করা হয়েছিল। কারণ এতে ব্যবহৃত “ওল্ড মাইন ব্রিলিয়েন্ট কাট’’ আধুনিক কাটেরও আগের পদ্ধতি।

এই হীরার ইতিহাসও বেশ আকর্ষণীয়। স্মিথসোনিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৮ সালে এটি প্রথম কার্টিয়ার পরিবারের কাছে ছিল। পরে তারা এটিকে ভারতের জামনগরের মহারাজার কাছে বিক্রি করেন। আবার ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে রোনাল্ড উইনস্টন মহারাজার কাছ থেকে এটি কিনে নেন। ১৯৮৯ সালে এই হীরেটি দিয়ে তৈরি একটি আংটি পরেছিলেন অভিনেত্রী ব্রুক শিল্ডস। যদিও হীরেটি বিরল, তবে এটি কিন্তু সবচেয়ে বড় লাল হীরে নয়। তা সত্ত্বেও উইনস্টন রেড তার বিশুদ্ধ রঙ এবং বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের কারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হীরের রঙ সাধারণত তার রাসায়নিক গঠনের উপর নির্ভরশীল। সাধারণ সাদা হীরে মূলত কার্বন দিয়ে তৈরি। এতে সামান্য নাইট্রোজেন থাকলে হলুদ আভা দেখা যায়। সময়ের সঙ্গে নাইট্রোজেনের বিন্যাস বদলালে হীরে বাদামি বা আরও গাঢ় রঙ ধারণ করতে পারে। আবার বোরন থাকলে হীরের রঙ হয় নীল। কিন্তু লাল বা গোলাপি হীরের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ আলাদা। এদের রঙ রাসায়নিক উপাদানের কারণে নয়, বরং ভূগর্ভস্থ চরম চাপ ও তাপমাত্রার ফলে সৃষ্টি হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘প্লাস্টিক ডিফরমেশন’। এতে হীরের ভেতরের পরমাণু বন্ধন ভেঙে যায় এবং নতুনভাবে এটি গঠিত হয়। ফলে কিছু স্খলন বা ‘ডিসলোকেশন’ তৈরি হয়। এই গঠনগত পরিবর্তনের ফলে আলো ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়, যা হীরেকে লাল বা গোলাপি আভা দেয়।

উইনস্টন রেড একটি ‘ফ্যান্সি রেড’ ডায়মন্ড। অর্থাৎ এর রঙ একেবারে বিশুদ্ধ লাল। এর মধ্যে বেগুনি, বাদামি বা কমলার কোনো মিশ্রণ নেই। অনুমান, প্রতি ২ কোটি ৫০ লক্ষ হীরের মধ্যে মাত্র একটি ফ্যান্সি রেড হীরে হতে পারে। ফ্যান্সি রঙের হীরের মধ্যেও মাত্র ০.০৪ শতাংশ হীরে এই বিশুদ্ধ লাল শ্রেণির। গবেষকরা হীরেটিকে বিশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, যেমন- ফটোলুমিনেসেন্স, স্পেকট্রোস্কপি এবং ক্যাথোডোলুমিনেসেন্স। এই পরীক্ষাগুলোতে হীরার ভেতরে প্লাস্টিক ডিফরমেশনের বিশেষ চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর ভিত্তিতেই এটিকে “টাইপ IaAB (A<B) গ্রুপ ১ পিঙ্ক ডায়মন্ড’’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। হীরের গঠনকালে সঠিক মাত্রার চাপ ও তাপমাত্রা কাজ করেছিল, সেটাই এর গাঢ় লাল রঙের জন্য দায়ী। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই এটিকে এত বিরল ও মূল্যবান করে তুলেছে। সব মিলিয়ে, উইনস্টন রেড ডায়মন্ড শুধু একটি দৃষ্টিনন্দন রত্নই নয়, এটি পৃথিবীর গভীরে কোটি কোটি বছর ধরে চলা জটিল ভৌত প্রক্রিয়ার একটি অনন্য সাক্ষ্যও বটে।

 

সূত্রঃ popular Science

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten − 7 =