স্বার্থপর জিন ও জীবনের গোপন সমঝোতা 

স্বার্থপর জিন ও জীবনের গোপন সমঝোতা 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১১ এপ্রিল, ২০২৬

প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স ‘’paradox of the organism’’/ ‘ জীবের কূটাভাস’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন একটি জটিল ধারণাকে উত্থাপন করার জন্য। তাঁর মতে জিন ‘স্বার্থপর’ হয়ে যেকোনো মূল্যে নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করে। আবার কিছু জিন এমন আচরণও করতে পারে, যা সমগ্র দেহের জন্যই ক্ষতিকর হবে।

উদাহরণস্বরূপ, ডিএনএর কিছু অংশ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় লাফিয়ে চলে যেতে পারে, নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করে জিনোমের বিভিন্ন স্থানে বসে পড়তে পারে। মানব জিনোমের প্রায় অর্ধেক এই ধরনের ‘জাম্পিং জিন’ দ্বারা গঠিত । বিবর্তন ও জিন বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে এদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একইসঙ্গে, এগুলো ক্ষতিকর মিউটেশন/পরিব্যক্তিও ঘটাতে পারে। এধরনের জাম্পিং জিনেরা গুরুত্বপূর্ণ জিনের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করলে ক্যান্সার প্রভৃতি গুরুতর রোগও হতে পারে। সম্প্রতি

“The Paradox of the Organism: Adaptation and Internal Conflict” বইতে শীর্ষস্থানীয় বিবর্তনবিদ ও দার্শনিকরা এই ধরনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়ে নানা প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, কীভাবে অসংখ্য প্রতিযোগী উপাদানে গঠিত একটি দেহ একসঙ্গে কাজ করে বেঁচে থাকার ও বংশবিস্তারের লক্ষ্য পূরণে ।

বইটির সম্পাদক J. Arvid Agren এবং Manus M. Patten। তাঁরা এই কঠিন বিষয়টিকে সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁরা এই বইয়ের ব্যাখ্যা স্বরূপ বলেছেন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব জীবদেহের একটি কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য, এটি কোনো পার্শ্ব বিষয় নয়। তাই বিকাশ, বিবর্তন, ক্যান্সারসহ নানা ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্বকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

বিবর্তনবিদ ডেভিড হেইগ যুক্তি দেন, আমাদের পুরো দেহই এমনভাবে গঠিত, যাতে স্বার্থপর জিনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আর এটি সম্ভব হয় জননকোষ (ডিম্বাণু, শুক্রাণু এবং তাদের পূর্বসূরি),এবং দেহকোষ (দেহের বাকি সব কোষ)-এর বিভাজনের মাধ্যমে। দেহকোষ কখনো নতুন জীব তৈরি করে না, তাই সেখানে স্বার্থপর জিনের বিস্তার তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু জননকোষে, বিশেষ করে মিয়োসিস প্রক্রিয়ায় (যেখানে ডিএনএ মিশ্রিত হয় ও ক্রোমোজোম আলাদা হয়), স্বার্থপর জিন ছড়ানোর সুযোগ অনেক বেশি থাকে।

এই ঝুঁকি মোকাবিলায়—বিশেষ বিশেষ দেহকোষ অস্বাভাবিক জননকোষকে ধ্বংস করার সংকেত পাঠায় এবং জনন কোষ নিজেরাই জিনের প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করে।

বিবর্তনবিদ টমাস স্কট ও স্টুয়ার্ট ওয়েস্ট জিনোমকে একটি সংসদ-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। সংসদে যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী আইন পাশ হয়, তেমনি জিনোমের বেশির ভাগ অংশ একসঙ্গে কাজ করে জীবের মঙ্গল নিশ্চিত করতে এবং ক্ষতিকর জিনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

ম্যানাস প্যাটেন দেখান, দেহ কিছু স্বার্থপর জিনকে সহ্য করতে পারে। কারণ অনেক জাম্পিং জিনই তেমন ক্ষতিকর নয়। কিন্তু কিছু জিন আবার খুবই বিপজ্জনক, তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

উদাহরণস্বরূপ, X ড্রাইভার নামের কিছু জিন সন্তানের লিঙ্গ অনুপাত পরিবর্তন করতে পারে। এগুলো X ক্রোমোজোমে থাকে এবং Y-বহনকারী শুক্রাণুকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করে। ফলে বেশি সংখ্যক মেয়ে সন্তান জন্মায়।

এ ধরনের জিন গোটা একটা প্রজাতির জন্যই একপ্রকার হুমকি। তাই প্রাকৃতিক নির্বাচন এমন “দমনকারী’’ জিন তৈরি করে, যা এই ক্ষতিকর প্রভাবকে দমন করে শৃঙ্খলা বজায় থাকে। এই ধারণা শুধু তাত্ত্বিক নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।

Agren ও বিবর্তনবিদ Amy Boddy বলেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান মানবদেহকে একটি যন্ত্র হিসেবে দেখে, যা একেবারেই ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। বরং দেহকে দেখা উচিত একটি সমষ্টি হিসেবে, যেখানে বিভিন্ন জৈব উপাদান কখনো সহযোগিতা করে, কখনো প্রতিযোগিতা করে।

যেমন ক্যান্সার। এটি কোষের এক ধরনের প্রতারণা, যা নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে নিজস্ব বৃদ্ধির পথে এগোয়। তাই ক্যান্সার পুরোপুরি নির্মূল করার বদলে, এর বিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করা একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে। গর্ভাবস্থাতেও এমন দ্বন্দ্ব দেখা যায়। যখন ভ্রূণ পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না, তখন প্লাসেন্টা এমন সংকেত দেয় যা মায়ের রক্তচাপ বাড়ায়। এতে পুষ্টির প্রবাহ বাড়ে, কিন্তু এতেই আবার প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া নামক বিপজ্জনক অবস্থা তৈরি হতে পারে। এই ধারণা বিবর্তনী চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক্ষেত্রে রোগকে বোঝা হয় বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে।

যেমন জ্বর জিনিসটা অস্বস্তিকর হলেও রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। প্রদাহ ক্ষতিকর হলেও জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জরুরি। এই দৃষ্টিভঙ্গি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ এবং ক্যান্সার গবেষণাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই বইটি সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান দেয় না, বরং নতুন প্রশ্ন তোলে। কিন্তু সেটাই তো আসল বিষয়। কূটাভাসের সমাধান কোনো সহজ সমস্যা নয়। এগুলো আমাদের বোঝাপড়ার সীমা পরীক্ষা করে, প্রকৃতির জটিলতাকে তুলে ধরে। এই বই থেকে স্পষ্ট হয় যে এত জটিলতার মাঝেও জীবদেহ কীভাবে বিবর্তনের আণবিক স্তরের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে

ঠিকমতো কাজ করে। মোটকথা, আমাদের শরীর একেবারেই নিখুঁত নয়, বরং অসংখ্য সংঘাতের মধ্যেও টিকে থাকা এক সমঝোতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − 3 =