প্রাকৃতিক তেল বনাম অ্যান্টিবায়োটিক

প্রাকৃতিক তেল বনাম অ্যান্টিবায়োটিক

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১২ এপ্রিল, ২০২৬

আধুনিক কৃষি ও পশুপালনে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি আরকানসাস এগ্রিকালচারাল এক্সপেরিমেন্ট স্টেশনের গবেষকদের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা আধুনিক শূকর খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক উদ্ভিদজাত তেলের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে। এই গবেষণার বিশদ বিবরণ অ্যানিম্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ওয়ান হেলথ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল।

গবেষণাটি মূলত রোজমেরি ও ওরেগান থেকে প্রাপ্ত ফাইটোকেমিক্যালের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে। বিশেষ করে যারা সদ্য স্তন্যপান করা ছেড়েছে সেই শূকরছানাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি এই পরীক্ষা চালানো হয়। সাধারণত এই সময়টি শূকরদের জীবনের সবচেয়ে চাপপূর্ণ ধাপ—খাদ্য পরিবর্তন, পরিবেশের বদল এবং মায়ের থেকে বিচ্ছিন্নতা তাদের অন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

দুধ ছাড়ার পর শূকরছানাদের খাদ্যে এই প্রাকৃতিক উপাদানগুলো যোগ করলে তাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে বৃদ্ধি ও উৎপাদনক্ষমতা বাড়ে। এর প্রধান কারণ হলো—এই উপাদানগুলো অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা পুষ্টি শোষণকে আরও কার্যকর করে তোলে।

অন্যদিকে, প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক ও উচ্চমাত্রার জিঙ্ক প্রথম দিকে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটালেও, সেই সুবিধা স্থায়ী হয় না। বরং, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণু বিরোধী প্রতিরোধ তৈরি হয়, যা বিশ্বব্যাপী একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। পাশাপাশি, অতিরিক্ত জিঙ্ক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, কারণ এটি মাটিতে জমে গিয়ে উদ্ভিদের ক্ষতি করতে পারে।

গবেষণায় মোট ১৯২টি শূকরছানাকে চারটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দল কোনো চিকিৎসা পায়নি, একটি দল অ্যান্টিবায়োটিক ও জিঙ্ক পেয়েছে, এবং বাকি দুইটি দল রোজমেরি ও ওরেগান নির্ভর ফাইটোকেমিক্যাল গ্রহণ করেছে। ফলাফল অনুযায়ী, যেসব শূকর দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রাকৃতিক উপাদান গ্রহণ করেছে, তারা ১৫৫ দিনের শেষে সবচেয়ে বেশি ওজন অর্জন করে এবং খাদ্যকে সবচেয়ে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়।

মাইক্রোবায়োম বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ফাইটোকেমিক্যাল গ্রহণকারী শূকরদের অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি বেশি ছিল, ক্ষতিকর জীবাণুর সংখ্যা ছিল কম। এর ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মানসিক স্থিতিশীলতাও উন্নত হয়। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, এই শূকরগুলো তুলনামূলকভাবে কম আক্রমণাত্মক আচরণ প্রদর্শন করেছে।

গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী সুং চেং সাই উল্লেখ করেন, “প্রাকৃতিক উপাদানগুলো হয়তো তাৎক্ষণিক ফল দেয় না, কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদে প্রাণীর শরীরকে এমনভাবে প্রস্তুত করে তোলে, যাতে তারা ভবিষ্যতের চাপ আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারে।”

আরও একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, ফাইটোকেমিক্যাল গ্রহণকারী শূকরগুলো তুলনামূলকভাবে কম আক্রমণাত্মক আচরণ প্রদর্শন করেছে, যা তাদের সামগ্রিক সুস্থতার ইঙ্গিত দেয়। এই গবেষণা শুধু একটি বিকল্প পদ্ধতির কথাই বলছে না, উপরন্তু কৃষি ব্যবস্থার একটি সম্ভাব্য রূপান্তরের দিক নির্দেশ করছে। কম অ্যান্টিবায়োটিক, কম পরিবেশ দূষণ, এবং আরও স্বাস্থ্যকর প্রাণী—এই তিনের সমন্বয়ে ভবিষ্যতের টেকসই পশুপালনের পথ হয়তো এখানেই লুকিয়ে আছে।

 

সূত্র: “Longitudinal Modulation of the Gut Microbiome and Growth Performance by Phytochemicals as Antibiotic Alternatives in Swine Production” by Ziyu Liu, Samantha Howe,et.al;6 February 2026, Animal Research and One Health.

DOI: 10.1002/aro2.70054

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × two =