অ্যাম্বারে সংরক্ষিত বিরল মাকড়শা প্রজাতি 

অ্যাম্বারে সংরক্ষিত বিরল মাকড়শা প্রজাতি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

সম্প্রতি ইউক্রেনের রোভনো এবং বাল্টিক অঞ্চলের অ্যাম্বারে সংরক্ষিত এক অজানা মাকড়শা প্রজাতি শনাক্ত করেছেন জার্মানি ও বুলগেরিয়ার একদল গবেষক। নতুন এই প্রজাতির নাম রাখা হয়েছে বাল্টিকোলাজমা ওয়ান্ডারলিচি, যা হারভেস্টম্যান বা অপিলিওন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই আবিষ্কারের নেতৃত্ব দেন জার্মানির বাভারিয়ান স্টেট কালেকশনস অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির (এস এন এস বি) জীবাশ্মবিদ ড. ক্রিশ্চিয়ান বার্টেল। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক জার্নাল অ্যাক্টা প্যালিএন্টোলজিকা পোলোনিকা-তে। গবেষকদের মতে, এই জীবাশ্মটি ইওসিন যুগের, যখন পৃথিবীর পরিবেশ আজকের তুলনায় অনেক অন্যরকম ছিল।

এই আবিষ্কারের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, কারণ এটি অর্থোলাসম্যাটিনা উপগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এই উপগোষ্ঠীর কোনো জীবাশ্ম এতদিন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক নথিতে ছিল না। আজকের পৃথিবীতে এই গোষ্ঠীর সদস্যরা ইউরোপে অনুপস্থিত; এদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা সীমাবদ্ধ পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকার নির্দিষ্ট অঞ্চলে। ফলে এই জীবাশ্ম কেবল একটি নতুন প্রজাতির সন্ধানই নয়, প্রাচীন পৃথিবীতে প্রাণীদের বিস্তৃতি ও পরিবেশগত ইতিহাস পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্রও বটে।

অ্যাম্বার হল গাছের শক্ত হয়ে যাওয়া রজন, প্রাকৃতিকভাবে জীব সংরক্ষণের এক অনন্য মাধ্যম। লক্ষ লক্ষ বছর আগে কোনো ক্ষুদ্র প্রাণী যখন এই আঠালো পদার্থে আটকে পড়ে, তখন তার শরীরের সূক্ষ্মতম বৈশিষ্ট্য পর্যন্ত অবিকৃত থেকে যায়। বাল্টিকোলাজমা ওয়ান্ডারলিচি -এর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে। এর দেহের সূক্ষ্ম অলংকরণ, জালের মতো গঠন এবং চোখের উঁচু অংশ আজও স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা অত্যাধুনিক ত্রিমাত্রিক চিত্রায়ন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। হামবুর্গের DESY-তে কম্পিউটেড টমোগ্রাফি (CT) স্ক্যানের মাধ্যমে জীবটির দেহের ভেতরের গঠন বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, এর শরীরের উপরিভাগে সূক্ষ্ম খাঁজের জটিল নকশা এবং বহুখণ্ডিত মুখাঙ্গ রয়েছে। যা থেকে এর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া গেল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর ভৌগোলিক তাৎপর্য। গবেষকদের মতে, প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বছর আগে এই হারভেস্টম্যান গোষ্ঠীর অমেরুদণ্ডী আটটি পা বিশিষ্ট প্রাণী উত্তর গোলার্ধ জুড়ে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত পরিবর্তন, জলবায়ু রূপান্তর এবং অন্যান্য বিবর্তনীয় কারণে এদের বিস্তার সংকুচিত হয়ে যায়। আজ তারা ইউরোপ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত।

এই আবিষ্কার অতীতের হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ, প্রাণীর বিস্তার এবং বিবর্তনের দীর্ঘ যাত্রার একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে কাজ করে।

 

সূত্র: “3D analyses of the first ortholasmatine harvestmen from European Eocene ambers” by Christian Bartel, Plamen G. Mitov, et.al; 2026, published in ‘Acta Palaeontologica Polonica’.

DOI: 10.4202/app.01283.2025

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − 17 =