আকাশে উড়ন্ত পাখি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে পথ খুঁজে নেয়। তেমনই, জলের নীচে কিছু ব্যাকটেরিয়াও এই অদৃশ্য শক্তির সাহায্যে চলাচল করে। একদল ব্যাকটেরিয়াকে কখনও উপরের দিকে, কখনও নীচের দিকে সাঁতার কাটতে দেখা যায়। এটি আসলে চৌম্বক ক্ষেত্রেরই প্রভাব। এই বিশেষ জীবগুলিকে বলা হয় ম্যাগনেটোট্যাকটিক বা চুম্বক-সংবেদী ব্যাকটেরিয়া। মিষ্টি জল থেকে সমস্ত বিভিন্ন জলাশয়ে এদের বিস্তার। এমনকি কোথাও কোথাও মোট অণুজীবের প্রায় ৩০%-ই এই ব্যাকটেরিয়া। এদের ভেতরে থাকে ‘ম্যাগনেটোসোম’বা চুম্বক কণাধারী অঙ্গাণু। এরা হল লৌহজাত ক্ষুদ্র কণার শৃঙ্খল, যা কোষের ভিতরে ঝিল্লি দিয়ে আবৃত। এই গঠন ব্যাকটেরিয়াকে চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে নিজেকে সারিবদ্ধ করতে সাহায্য করে, ফলে তারা সহজেই উপর-নীচে চলাচল করতে পারে।
অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া যেখানে নানা দিকে চলে, সেখানে এরা মূলত উল্লম্ব গতিতে সীমাবদ্ধ। কারণ জলে অক্সিজেনের পরিমাণ স্তরভেদে বদলায়। উপরে বেশি, নীচে কম। চুম্বক-সংবেদী ব্যাকটেরিয়া এমন এক স্তরে থাকতে চায় যেখানে অক্সিজেনের মাত্রা মাঝামাঝি। যাকে অক্সিজেন যুক্ত থেকে অক্সিজেন-হীন স্তরে উত্তরণের পর্যায় বলা হয়। চৌম্বক ক্ষেত্রের রেখা ধরে চলার ফলে তারা দ্রুত ও কম শক্তি খরচ করে এই উপযুক্ত স্তরে পৌঁছাতে পারে। এদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে সরু সরু শুঁড়ের মতো ফ্ল্যাজেলা। বেশি অক্সিজেন পেলে এরা নীচে নামে, কম অক্সিজেন পেলে উপরে ওঠে। চৌম্বক ক্ষেত্র থাকলে এদের গতি আরও বাড়ে। এছাড়া চুম্বক কণাধারী অঙ্গাণু হয়তো এদের পরিবেশগত চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে, ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণ ও লৌহ সংরক্ষণেও কাজ করতে পারে।
এইসব ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহারিক গুরুত্বও বিশাল। বিজ্ঞানীরা এগুলিকে ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, বিশেষ করে ক্যান্সার চিকিৎসায়, নতুন সম্ভাবনা দেখছেন। চৌম্বক ক্ষেত্র দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে এদের টিউমারে পৌঁছে দিয়ে তাপ উৎপাদনের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা সম্ভব। একে ম্যাগনেটিক হাইপারথার্মিয়া বলা হয়। এছাড়া, এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অনুপ্রেরণায় তৈরি হচ্ছে চুম্বক নিয়ন্ত্রিত মাইক্রোরোবট, যা ভবিষ্যতে জমাট রক্ত ভাঙা বা সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারে কাজে লাগতে পারে। বিজ্ঞানীরা “ম্যাগনেটোফসিল’’ ও জিন বিশ্লেষণের মাধ্যমে এদের বিবর্তনের ইতিহাসও অনুসন্ধান করছেন। ধারণা করা হয়, প্রাচীন পৃথিবীতে লোহা সংরক্ষণের জন্য তৈরি হওয়া এই গঠন পরে চৌম্বক দিকনির্দেশে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, বিশেষত ‘গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্ট’-এর পর। আজকের ম্যাগনেটোট্যাকটিক ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কেউ ১০–৫০টি, কেউ শত শত চুম্বক কণা তৈরি করে, যাদের আকারও ভিন্ন ভিন্ন। ক্ষুদ্র হলেও, এদের ক্ষমতা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: American Society for Microbiology; April; 2026
