এ আই-এর সঙ্গলাভের ফাঁদ

এ আই-এর সঙ্গলাভের ফাঁদ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি কেবল একটি সহায়ক প্রযুক্তি, নাকি এটি ধীরে ধীরে আমাদের বাস্তবতাকে দেখার ধরনটাকেই বদলে দিচ্ছে? ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। গবেষণাটি দেখায়, জেনারেটিভ এ আই আমাদের চিন্তার পরিধি পেরিয়ে এখন আমাদের বিশ্বাস, স্মৃতি এবং আত্মপরিচয়েও প্রভাব ফেলছে।

গবেষক লুসি অসলার “ডিস্ট্রিবিউটেড কগনিশন’’ তত্ত্বের আলোকে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন যে, যখন মানুষ চিন্তা করা, স্মরণ করা এবং নিজের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করার জন্য নিয়মিত এ আই -এর ওপর নির্ভর করে, তখন এ আই তাদের মানসিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে। এর ফলে একটি নতুন ধরনের সমস্যার উদ্রেক হয়। মানুষ এ আই -এর ভুল তথ্য কেবল গ্রহণই করে না, তার উপর এ আই -এর সঙ্গে মিলে ভুল ধারণা গড়ে তুলতেও শুরু করে দেয়। একে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গলাভের বিভ্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

এ আই -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ব্যবহারকারীর দেওয়া তথ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে কথোপকথন তৈরি করে। ফলে যদি ব্যবহারকারীর বিশ্বাস ভুল বা বিভ্রান্তিকর হয়, তাহলে এ আই সেটিকে শুধরে দেওয়ার পরিবর্তে সেটাকেই অনেক সময় উসকে দিয়ে আরও বিভ্রান্তি ছড়ায়। এতে করে মিথ্যা ধারণা আরও গভীরভাবে প্রোথিত হতে পারে। বিশেষ করে, চ্যাটবটের মতো এ আই সিস্টেমগুলো মানুষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলে, যেন তারা একজন সহানুভূতিশীল সঙ্গী। এরা সমাজস্বীকৃত ভুল ধারণাকেও বাস্তব বলে মনে করাতে পারে।

এই গবেষণায় এ আই -এর এই দ্বৈত ভূমিকার উল্লেখ করা হয়েছে – একদিকে এটি চিন্তার সহায়ক, অন্যদিকে কথোপকথনের সঙ্গী। সাধারণ সরঞ্জাম, যেমন নোটবুক বা সার্চ ইঞ্জিন কেবল তথ্য সংরক্ষণ করে। কিন্তু এ আই মানুষের ধারণাকে সমর্থন করে এবং সেই ধারণা ভুল হলেও সেটাকেই প্রসারিত করে। এর ফলে বিভ্রান্তিকর স্মৃতি, বিকৃত আত্মপরিচয়, এমনকি ভ্রান্ত বিশ্বাস বা বিভ্রমও তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে যারা একাকী বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। কারণ এ আই তাদের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও সহজলভ্য সঙ্গী হিসেবে কাজ করে, যেখানে তারা সহজেই নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করতে পারে। এই সুবিধাই কখনও কখনও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, কারণ এ আই সবসময় সেই বিশ্বাসের ঠিকভুল বিচার করে না।

গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, উন্নত ফ্যাক্ট-চেকিং, কম পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে এ আই -এর এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবুও, একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েই যায়। এ আই বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা বা সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝতে পারে না, ফলে কখন ব্যবহারকারীর সঙ্গে একমত হওয়া উচিত আর কখন তাকে সংশোধন করা উচিত, সেটা সে নির্ধারণ করতে পারে না।

এ আই কেবলমাত্র একটি যান্ত্রিক সরঞ্জাম নয়। এটি এমন এক অদৃশ্য প্রভাবক, যা ধীরে ধীরে আমাদের বাস্তবতাকে বোঝার চোখটাকেই বদলে দিতে পারে।

 

সূত্র: “Hallucinating with AI: Distributed Delusions and “AI Psychosis”” by Lucy Osler, 11 February 2026, Philosophy & Technology.

DOI: 10.1007/s13347-026-01034-3

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten − one =