ভয়েজার–১-এর একটি যন্ত্র বন্ধ করা হল

ভয়েজার–১-এর একটি যন্ত্র বন্ধ করা হল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

ভয়েজার–১-এর বয়স হচ্ছে। তাকে আরও কিছুদিন সচল রাখতে বড় সিদ্ধান্ত নিল নাসা। বহু বছর ধরে সক্রিয় একটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বন্ধ করে দিয়েছেন নাসার প্রকৌশলীরা। লক্ষ্য একটাই, বয়স্ক এই মহাকাশযানের আয়ু যতটা সম্ভব বাড়ানো। গত ১৭ এপ্রিল এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রায় ৪৯ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলা যন্ত্রটির কাজ শেষ হলো। এ জন্য নয় যে সেটি নষ্ট হয়ে গেছে। বন্ধ করার উদ্দেশ্য হল সীমিত শক্তি সঞ্চয় করে মহাকাশযানটিকে আরও কিছুদিন সচল রাখা। ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ভয়েজার–১। পৃথিবী থেকে এখন প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে এটির অবস্থান। মানুষের তৈরি আর কোনো বস্তু এত দূরে পৌঁছয়নি। তাই ভয়েজার–১ মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। ভয়েজার–১ সৌরশক্তি ব্যবহার করে না। সূর্য থেকে এত দূরে চলে যাওয়ায় সেখানে সূর্যালোক খুবই দুর্বল। তাই এটি বিদ্যুৎ পায় প্লুটোনিয়ামের তেজস্ক্রিয় ক্ষয় থেকে উৎপন্ন তাপের মাধ্যমে। এই তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয় বিশেষ ব্যবস্থায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শক্তি কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ৪ ওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। ফলে কোন যন্ত্র চালু থাকবে আর কোনটি বন্ধ হবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে বিজ্ঞানীদের। যে যন্ত্রটি এবারে বন্ধ করা হল, সেটি নিম্ন-শক্তির আহিত কণার পরিমাপ করত। সেই তথ্যের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক রশ্মি, সৌরজগতের বাইরের পরিবেশ এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক অঞ্চলের অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পেতেন। দীর্ঘদিন ধরে এই যন্ত্র ভয়েজার মিশনের অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করেছে। তবে এখন মিশনের লক্ষ্য কিছুটা বদলেছে। আগে যত বেশি সম্ভব বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মহাকাশযানটির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং এটিকে সচল রাখা। তাই বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহের চেয়ে টিকে থাকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভয়েজার–১-এর সঙ্গে যোগাযোগ করাও এখন সহজ নয়। এত দূরত্বের কারণে পৃথিবী থেকে পাঠানো সংকেত মহাকাশযানে পৌঁছাতে প্রায় ২৩ ঘণ্টা সময় লাগে। আবার সেখান থেকে উত্তর আসতেও একই সময় লাগে। অর্থাৎ একটি নির্দেশ পাঠিয়ে ফল জানতে প্রায় দুই দিন অপেক্ষা করতে হয়। তাই প্রতিটি কমান্ড অত্যন্ত সতর্কভাবে পরিকল্পনা করে পাঠাতে হয়। শক্তির মাত্রা যদি খুব কমে যায়, তাহলে ভয়েজার–১ নিজে থেকেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা বন্ধ করে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে পারে। এতে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সেই আশঙ্কা এড়াতেই আগে থেকেই নিয়ন্ত্রিতভাবে যন্ত্র বন্ধ করা হচ্ছে। নাসার হিসাব অনুযায়ী, এই একটি যন্ত্র বন্ধ করার ফলে ভয়েজার–১-এর কার্যক্ষমতা অন্তত আরও এক বছর বাড়তে পারে। বর্তমানে মহাকাশযানটিতে আরও দুটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র চালু আছে। সেগুলো এখনও আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্য থেকে তথ্য পাঠিয়ে যাচ্ছে। যে অঞ্চলে আগে কোনো মহাকাশযান সরাসরি অনুসন্ধান চালায়নি। প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত যন্ত্র বন্ধ করা, শক্তি নতুনভাবে বণ্টন করা এবং শুধু অপরিহার্য সিস্টেম সচল রাখা প্রভৃতি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে যাত্রা শুরু করা ভয়েজার–১ আজও মানুষকে মহাবিশ্ব সম্পর্কে নতুন তথ্য দিচ্ছে। প্রযুক্তির সীমা ছাড়িয়ে এই মহাকাশযান যেন মানুষের কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং অনুসন্ধিৎসার এক জীবন্ত প্রতীক।

 

সূত্র: Theory of everything; April; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 4 =