পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় সাধারণত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বরফ গলা বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কথা বেশি শোনা যায়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এবার নজর দিচ্ছেন আরও নীরবে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে এমন এক পরিবর্তনের দিকে। সেটা হল সমুদ্রের লবণাক্ততা। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার উপকূলসংলগ্ন দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গত ৬০ বছরে নজিরবিহীন হারে লবণাক্ততা কমেছে। এই পরিবর্তন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জলবায়ুর জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় জানা গেছে, এই অঞ্চলে উচ্চ-লবণাক্ত জলের বিস্তৃতি ১৯৬০-এর দশক থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। অর্থাৎ, যে সমুদ্রাঞ্চল একসময় তুলনামূলকভাবে বেশি লবণাক্ত ছিল, তা দ্রুত বদলে গিয়ে এখন অনেক বেশি কম লবণাক্ত মিঠে জলের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, গত ছয় দশকে এমন পরিবর্তন কখনও দেখা যায়নি।
সমুদ্রের লবণাক্ততা মহাসাগরীয় ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক। জলে যত বেশি লবণ থাকে, তার ঘনত্ব তত বেশি হয়। এই ঘনত্ব নির্ধারণ করে সমুদ্রের স্তরবিন্যাস, স্রোতের প্রবাহ, গভীর জল থেকে পুষ্টি উপরে ওঠার প্রক্রিয়া এবং বিশ্বজুড়ে তাপ বণ্টনের ধরণ। তাই লবণাক্ততার পরিবর্তন মানে সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের পরিবর্তন।
গবেষকরা বলছেন, স্থানীয় বৃষ্টিপাত এই মিঠে হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ নয়। আসলে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর বায়ুপ্রবাহের ধরণ বদলে যাচ্ছে। এর ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক ফ্রেশওয়াটার পুল নামে পরিচিত এক বিশাল বৃষ্টিনির্ভর কম-লবণাক্ত জলভাণ্ডার থেকে অতিরিক্ত মিঠে জল দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের দিকে সরে আসছে।
যখন সমুদ্রের উপরিভাগে বেশি মিঠে জল জমা হয়, তখন সেই স্তর হালকা হয়ে যায় এবং নীচের ভারী, লবণাক্ত জলের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে না। এতে সমুদ্রের স্তরবিন্যাস আরও শক্তিশালী হয়। ফলস্বরূপ গভীর স্তর থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাসসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপরে উঠতে বাধা পায়। এতে প্ল্যাঙ্কটন, সি-গ্রাস, মাছ এবং পুরো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, দক্ষিণ ভারত মহাসাগর বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা-নিয়ন্ত্রিত মহাসাগরীয় সঞ্চালনের সঙ্গে যুক্ত। একে পৃথিবীর মহাসাগরীয় “কনভেয়ার বেল্ট’’ বলা হয়। এই ব্যবস্থাই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাপ পরিবহন করে জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখে। যদি এই অঞ্চলের লবণাক্ততায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ঘটে, তবে তার প্রভাব বহু দূরের আবহাওয়া ও জলবায়ুতেও পড়তে পারে।
সমুদ্র শুধু গরমই হচ্ছে না, তার রাসায়নিক ও ভৌত কাঠামোও বদলে যাচ্ছে। এই নিঃশব্দ রূপান্তর ভবিষ্যতের পৃথিবীকে কতটা পাল্টে দিতে পারে তার কোনো ধারণা আমাদের নেই , তাই এখনই গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টিকে বিচার করতে হবে নয়তো ভবিষ্যতে পস্তাতে হবে।
সূত্র: “The expanding Indo-Pacific freshwater pool and changing freshwater pathway in the South Indian Ocean,” Nature Climate Change, 2026.
