ডুবন্ত ভেনিসের ভবিষ্যৎ কী?

ডুবন্ত ভেনিসের ভবিষ্যৎ কী?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ মে, ২০২৬

ইতালির ঐতিহাসিক ঐতিহ্যমন্ডিত শহর ভেনিস প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে সমুদ্রের বুকে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সাথে একপ্রকার লড়াই করে টিকে আছে। জল, খাল, সেতু আর দ্বীপের ওপর গড়ে ওঠা এই শহর মানবসভ্যতার এক অনন্য স্থাপত্য বিস্ময়। কিন্তু এখন সেই ভেনিস ভয়াবহ সংকটে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে, একই সঙ্গে শহরটি ধীরে ধীরে নীচে বসে যাচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ঘন বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হচ্ছে ভেনিস।

সম্প্রতি গবেষকেরা ভেনিসকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচানোর সম্ভাব্য সব পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। তারা এবার কঠোর সিদ্ধান্তে এসেছেন। তারা মনে করছেন শহরটিকে রক্ষা করা সম্ভব হলেও, বর্তমানের পরিচিত ভেনিসকে ঠিক আগের অবস্থায় সংরক্ষণ করা প্রায় অসম্ভব।

বর্তমানে ভেনিসকে রক্ষার প্রধান ব্যবস্থা হলো MOSE barriers/ সমুদ্রতলে বসানো বিশাল ইস্পাতের চলমান গেট। যখন জোয়ার বা ঝড়ের সময় জলস্রোত বাড়ে, তখন এই গেট উঠে এসে ভেনিস উপহ্রদকে ভূমধ্যসাগর থেকে আলাদা করে দেয়। প্রায় ৬ বিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প ইতিমধ্যে শহরকে বহুবার রক্ষা করেছে।

তবে সমস্যা দিন দিন বাড়ছে বই কমছে না। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই গেট ১০৮ বার ব্যবহার করতে হয়েছে। আর ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই ৩০ বার চালু করতে হয়েছে। অর্থাৎ, সমুদ্র যত আড়ে বহরে বাড়বে, গেট তত বেশি সময় ধরে বন্ধ রাখতে হবে। এতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হবে, পর্যটনে প্রভাব পড়বে, উপহ্রদটির প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলে যাবে, এমনকি জল নিষ্কাশন ও নিকাশী ব্যবস্থাও জটিল হয়ে উঠবে।

গবেষকেরা আরও কিছু বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন। একটি হলো শহরের চারপাশে রিং ডাইক নির্মাণ, যা ভেনিসকে অগভীর হ্রদটির থেকে আলাদা করবে। আরেকটি বৃহত্তর পরিকল্পনা হলো পুরো উপহ্রদটিকে বিশাল বাঁধ দিয়ে ঘিরে ফেলে ক্রমাগত পাম্পের মাধ্যমে জল নিয়ন্ত্রণ করা। এতে ১০ মিটার পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি সামলানো যেতে পারে বটে, কিন্তু উপহ্রদটির জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক জীবন ধ্বংস হতে পারে।

সবচেয়ে চরম বিকল্প হলো শহরের বড় অংশ ও জনসংখ্যাকে নিরাপদ উঁচু স্থানে সরিয়ে নেওয়া। গবেষণা অনুযায়ী, যদি সমুদ্রপৃষ্ঠ ৫ মিটারের বেশি বাড়ে, যেটা আশঙ্কা করা হচ্ছে ২৩০০ সালের পরে ঘটতে পারে, তখন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।

এতে অর্থনৈতিক ব্যয়ও বিশাল। রিং ডাইক নির্মাণে ৫০০ মিলিয়ন থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ইউরো, সুপার লেভি প্রকল্পে ৩০ বিলিয়নের বেশি, আর শহর স্থানান্তরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো লাগতে পারে।

 এখন প্রশ্ন হলো, সবই তো না হয় হল, কিন্তু ভেনিসের সাংস্কৃতিক মূল্য কীভাবে মাপা হবে? কারণ যেকোনো সমাধানই হয়তো শহরটিকে বাঁচাবে, কিন্তু তার ঐতিহাসিক আত্মা, জলনির্ভর চরিত্র ও চিরচেনা সৌন্দর্যকে বদলে দেবে। ভেনিস আজ শুধু একটি শহরের সংকট নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে উপকূলীয় বিশ্বের ভবিষ্যতের প্রতীক।

সূত্র: https://theconversation.com/venice-is-sinking-we-analysed-every-plan-to-save-it-and-none-would-preserve-the-city-as-we-know-it-280891

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four + 5 =