অন্ত্র-মস্তিষ্ক বোঝাপড়ায় কফির ভূমিকা 

অন্ত্র-মস্তিষ্ক বোঝাপড়ায় কফির ভূমিকা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ মে, ২০২৬

কফি অনেকের কাছে শুধু অভ্যাস, কারও কাছে সারাদিনের শক্তির রসদ। অনেকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন তাৎক্ষণিক ঘুম তাড়ানোর একমাত্র অস্ত্র হল গরম কফি। তবে বিজ্ঞানীদের মতে আমাদের শরীরে কফির উপকারিতাকে আর হয়তো এতো সংকীর্ণ ঘেরাটোপের মধ্যে রাখা ঠিক হবে না। সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডের ‘এপিসি মাইক্রোবায়োম আয়ারল্যান্ডের’ গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেল, এ শুধু ঘুমই তাড়ায় না; বরং অন্ত্রের অদৃশ্য জীবজগৎ, মস্তিষ্কের কার্যকলাপ, মানসিক অবস্থা এবং স্মৃতিশক্তিকে মজবুত করতেও এর লম্বা হাত আছে। নিয়মিত কফি পান মানুষের গাট–ব্রেন অ্যাক্সিস বা অন্ত্র-মস্তিষ্ক অক্ষের জটিলতম যোগাযোগ ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক পত্রিকা নেচার কমিউনিকেশন্সে।

বিজ্ঞানীরা জানতেন, কফি হজমে সাহায্য করে এবং মানসিক সতেজতা বাড়ায়। কিন্তু ঠিক কীভাবে এই প্রভাব তৈরি হয়, তা একপ্রকার অজানাই ছিল। এবার নতুন এই গবেষণা সেই রহস্যের পর্দা কিছুটা সরিয়ে দিয়েছে।

গবেষণায় অংশ নেন ৬২ জন মানুষ। তাঁদের অর্ধেকই প্রতিদিন নিয়মিত ৩ থেকে ৫ কাপ কফি পান করেন। বাকি অর্ধেক ছিলেন কফি না-পান করা মানুষ। গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাস, মানসিক অবস্থা, স্ট্রেসের মাত্রা এবং অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বিশ্লেষণ করেন। মল ও প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করে তাঁরা দেখেন, নিয়মিত কফি পানকারীদের অন্ত্রে বিশেষ কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়ার আধিক্য রয়েছে।

এরপর সবাইকে দুই সপ্তাহের জন্য কফি ছাড়তে বলা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, এই বিরতির সময় নিয়মিত কফি পানকারীদের অন্ত্রের রাসায়নিক পরিবেশে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। পরে তাঁদের আবার কফি দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ জানতেন না কে পাচ্ছেন ক্যাফিনযুক্ত কফি আর কে পাচ্ছেন ক্যাফিনমুক্ত কফি।

অবাক করার মতোই একখানা ফলাফল হল। দেখা গেল দুই ধরনের কফিই মানুষের মানসিক চাপ, বিষণ্নতা এবং আবেগপ্রবণতা কমাতে সাহায্য করেছে। তবে ক্যাফিনমুক্ত কফি পানকারীদের শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তির উন্নতি হয়। গবেষকদের মতে, এর পেছনে কাজ করতে পারে কফির ভেতরে থাকা পলিফেনলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উদ্ভিজ্জ যৌগ।

অন্যদিকে ক্যাফিনযুক্ত কফি মনোযোগ, সতর্কতা এবং সজাগ থাকার প্রবণতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এটি উদ্বেগ কমাতে এবং শরীরের প্রদাহের ঝুঁকি হ্রাস করতেও সহায়ক হতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পানকারীদের অন্ত্রে Eggertella sp এবং Cryptobacterium curtum নামের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেশি থাকে। এরা হজম প্রক্রিয়া উন্নত করতে, পাকস্থলীর রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এছাড়া “Firmicutes” নামের একদল ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও বেশি পাওয়া গেছে, যাদের সঙ্গে ইতিবাচক আবেগ ও মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক রয়েছে।

এই গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী জন ক্রায়ান বলেছেন, “কফি শুধু ক্যাফিনের উৎস নয়; এটি এমন এক প্রকার পানীয়, যা আমাদের অন্ত্রের জীবাণু, বিপাকক্রিয়া এবং আবেগ ঘটিত সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।”

সঠিক মাত্রায় কফি পান একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসেরই অংশ , আবার এটি ভবিষ্যতে মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করার উপায় হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

 

সূত্র: “Habitual coffee intake shapes the gut microbiome and modifies host physiology and cognition” by Serena Boscaini, Thomaz F. S. Bastiaanssen, John F. Cryan, et.al; 21st April 2026, published in Nature Communications.

DOI: 10.1038/s41467-026-71264-8

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 4 =