অনেকক্ষণ ধরে একটি নোনতা বিস্কুট চিবোতে থাকলে হঠাৎ একসময় সেটির স্বাদ মিষ্টি লাগতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের লালারসে থাকা অ্যামাইলেজ নামের একটি উৎসেচক স্টার্চ ভেঙে সাধারণ চিনিতে পরিণত করে। আর কার শরীরে এই উৎসেচক কতটা থাকবে, তা নির্ভর করে একটি বিশেষ জিনের উপর। সম্প্রতি দেখা গেছে, পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার কেচুয়া জনগোষ্ঠীর শরীরে এই অ্যামাইলেজ জিনের কপির সংখ্যা অন্য অনেক জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, আলু চাষ ও খাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাসই এর প্রধান কারণ। গবেষণার জন্য বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানীরা পেরুর আন্দিজ অঞ্চল নিবাসী কেচুয়াভাষীদের ডিএনএ সংগ্রহ করেন। এরপর তা বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জিনগত তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তাতেই দেখা যাচ্ছে, কেচুয়া জনগোষ্ঠীর মানুষের শরীরে গড়ে ১০টি অ্যামাইলেজ জিনের কপি রয়েছে। অন্যদিকে, জিনগতভাবে কাছাকাছি হলেও আলুভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের দীর্ঘ ইতিহাস না থাকায় মেক্সিকোর মায়া জনগোষ্ঠীর মানুষের শরীরে এই জিনের গড় কপির সংখ্যা মাত্র ছয়টি। সহ গবেষক ওমের গোকচুমেন জানান, বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহ করছিলেন যে খাদ্যাভ্যাসের কারণে মানুষের শরীরে জিনগত পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে এর এত অকাট্য প্রমাণ খুব কম ক্ষেত্রেই পাওয়া গেছে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আলু নিজে মানুষের জিন বদলে দেয়নি। সে কাজ করেছে প্রকৃতির স্বাভাবিক নির্বাচন। গবেষকদের মতে, প্রায় ১০ হাজার বছর আগে কেচুয়া জনগোষ্ঠী প্রথম আলু চাষ শুরু করে। এরপর বহু প্রজন্ম ধরে যাঁদের শরীরে বেশি অ্যামাইলেজ জিন ছিল, তাঁরা স্টার্চসমৃদ্ধ খাবার সহজে হজম করতে পারতেন। ফলে তাঁদের বেঁচে থাকা ও বেশি সন্তানের জন্ম দেওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। ধীরে ধীরে সেই বৈশিষ্ট্য পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। গোকচুমেন বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “বিবর্তন কোনও নতুন ভবন তৈরি করে না, বরং ভাস্করের মতো ধীরে ধীরে একটি মূর্তি গড়ে তোলে।” বিবর্তনের হিসেবে ১০ হাজার বছর খুব দীর্ঘ সময় নয়। তবু এই অল্প সময়ের মধ্যেই কেচুয়া জনগোষ্ঠীর শরীরে এমন পরিবর্তন এসেছে। গবেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে মানুষের বিপাক-সংক্রান্ত জিনগুলি আগে যা ভাবা গিয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি নমনীয়। আরেক সহ গবেষক অ্যাবিগেইল বিঘ্যাম বলেন, মানুষের খাদ্য হজমের ক্ষমতা শুধুমাত্র প্রাগৈতিহাসিক যুগের উত্তরাধিকার নয়। নতুন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও আমাদের শরীর দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। অর্থাৎ, মানুষের বিবর্তনের গল্প এখনও থেমে নেই। আমাদের প্রতিদিনের খাবারও নিঃশব্দে বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের মানুষকে।
সূত্র: Nautilus Magazine ; May ; 2026
