পিঁপড়েদের আমরা সাধারণত দেখি নিরন্তর ছুটে চলতে। কখনও খাবারের জন্য, কখনও নিজেদের বসতি বাঁচানোর লড়াইয়ে। তাদের দুনিয়ায় প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে, অন্য বসতির বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধও হয়। তাই অ্যারিজোনার মরুভূমিতে দুই ভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়েকে শত্রুর বদলে অদ্ভুত এক বন্ধুত্বে জড়াতে দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন জীববিজ্ঞানী মার্ক মফেট। গবেষণার সময় তিনি এমন এক দৃশ্য দেখলেন, যা পিঁপড়েদের সম্পর্কে আমাদের চেনা ধারণাকেই উলটে দেয়। বড় আকারের হারভেস্টার পিঁপড়েরা (Pogonomyrmex barbatus) ধীরে ধীরে এসে দাঁড়াচ্ছে ছোট কোনো এক ধরনের পিঁপড়ের বাসার সামনে। তারপর তারা শরীর উঁচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে, যেন ইচ্ছে করেই নিজেদের তুলে দিচ্ছে ছোট পিঁপড়েদের জিম্মায়। এরপর শুরু হচ্ছে আরও অদ্ভুত দৃশ্য। ছোট ছোট কতকগুলো পিঁপড়ে বড় পিঁপড়েদের শরীরের উপর উঠে ছুটোছুটি করছে, কখনও চাটছে, কখনও হালকা কামড় বসাচ্ছে। যেন তারা বড় পিঁপড়েদের শরীর ঘষেমেজে পরিষ্কার করছে। মফেটের মতে, এটি অনেকটা সমুদ্রের “ক্লিনার ফিশ’’-এর মতো। সমুদ্রে যেমন ছোট মাছ বড় মাছের গা থেকে মৃত চামড়া বা পরজীবী খেয়ে দেয়, এখানেও হয়তো তেমনই এক বোঝাপড়া কাজ করছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, সাধারণত আক্রমণাত্মক স্বভাবের হারভেস্টার পিঁপড়েরা এই সময় সম্পূর্ণ শান্ত থাকে। এমনকি ছোট পিঁপড়েদের নিজেদের মুখের কাছেও ঘোরাঘুরি করতে দেয়। পিঁপড়েদের জগতে এমন বিশ্বাসের সম্পর্ক আগে কখনও দেখা যায়নি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই পুরো “সাফাই অভিযান’’ শুরু করে বড় পিঁপড়েরাই। তারাই শরীর টানটান করে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন ছোট পিঁপড়েদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। তারপর কয়েক সেকেন্ড থেকে কখনও পাঁচ মিনিট পর্যন্ত চলে এই অদ্ভুত পরিচর্যা। কাজ শেষ হলে বড় পিঁপড়েরা হঠাৎ শরীর ঝাঁকিয়ে ছোটদের সরিয়ে দেয়, যেন স্পা সেশন শেষ! কেন তৈরি হল এই অদ্ভুত সম্পর্ক? বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন। তবে তাঁদের ধারণা, এতে দুই পক্ষেরই কোনও না কোনও লাভ রয়েছে। আর সেই রহস্যই এখন সবচেয়ে বেশি টানছে গবেষকদের। হারভেস্টার পিঁপড়ে সাধারণত তেলসমৃদ্ধ বীজ খায়। সেই খাবারের ছোট ছোট অংশ বা ময়লা তাদের শরীরের বাইরের শক্ত আবরণে জমে থাকতে পারে, যা ছোট ছোট অন্য পিঁপড়েদের খাবার হিসেবে কাজে লাগে। বদলে অন্য কোন পিঁপড়েরা বড় পিঁপড়েদের শরীরের এমন সব জায়গা পরিষ্কার করে দিতে পারে, যেখানে তারা নিজেরা সহজে পৌঁছতে পারে না। তবে গল্পটা হয়তো শুধুই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নয়। গবেষকদের আরেকটি ধারণা, এই দুই প্রজাতির মধ্যে উপকারী অণুজীব বা মাইক্রোবও আদানপ্রদান হতে পারে, যা তাদের সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, এটি হতে পারে এক ধরনের “স্বাস্থ্য-জোট’’। ঠিক কেন এই সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তার স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি। কিন্তু আবিষ্কারটি একটি বড় সত্য সামনে এনেছে, পিঁপড়েদের কঠোর, যুদ্ধভরা জগতেও সহযোগিতা ও সহাবস্থানের জায়গা আছে। প্রকৃতি যেন আবারও মনে করিয়ে দিল, টিকে থাকার লড়াইয়ে শুধু শক্তি নয়, কখনও কখনও সহযোগিতাও সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
সূত্র: Nautilus Magazine ; May ; 2026
