মৌমাছির অনুকরণে ড্রোন প্রযুক্তি 

মৌমাছির অনুকরণে ড্রোন প্রযুক্তি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ মে, ২০২৬

মৌমাছির মস্তিষ্ক হতে পারে অত্যন্তই ক্ষুদ্র। কিন্তু তারা কয়েক কিলোমিটার দূরে উড়ে গিয়ে আবার নির্ভুলভাবে নিজের চাক খুঁজে ফিরে আসতে পারে। মৌমাছির এই অসাধারণ ক্ষমতাই এবার নতুন প্রজন্মের রোবট প্রযুক্তির অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন এক অভিনব চলাচল/নেভিগেশন ব্যবস্থা, যার নাম দেওয়া হয়েছে “বি-নেভ” (Bee nav) । এটি ছোট আকারের ড্রোনকে খুব কম শক্তি ও মেমোরি ব্যবহার করে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরতে সাহায্য করবে। এই গবেষণাটির সম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান পত্রিকা নেচারে।

বর্তমানের অধিকাংশ উন্নত রোবটিক নেভিগেশন প্রযুক্তি নির্ভর করে বিশাল ত্রিমাত্রিক মানচিত্র, শক্তিশালী কম্পিউটার এবং উচ্চক্ষমতার গ্রাফিক্স প্রসেসরের ওপর। ফলে এসব প্রযুক্তি সাধারণত বড় আকারের রোবট বা ব্যয়বহুল ড্রোনেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু মৌমাছি বা মরুভূমির পিঁপড়ের মতো ক্ষুদ্র প্রাণীরা খুব সামান্য স্নায়বিক শক্তি ব্যবহার করেই জটিল পরিবেশে পথ চিনে চলতে পারে। গবেষকেরা প্রকৃতির এই দক্ষতাকে প্রযুক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

বি-নেভ প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো মৌমাছির উড়ানের প্রকৌশল। মৌমাছি প্রথমবার চাক ছাড়ার আগে আশপাশের এলাকা ছোট ছোট বৃত্তে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করে। এতে পরিবেশের কিছু নির্দেশক দৃশ্য ও চিহ্ন তাদের মনে গেঁথে যায়। একই কৌশল অনুসরণ করে বি-নেভ ড্রোনও প্রথমে নিজের হোম বেসের চারপাশে একটি ছোট শিক্ষামূলক উড়ান সম্পন্ন করে।

এই উড়ানের সময় ড্রোন একটি সর্বদিক-দর্শী ক্যামেরা দিয়ে চারপাশের ছবি সংগ্রহ করে। তার সাহায্যে নিজের চলার দিক ও দূরত্ব হিসাব করে একটি হোম ভেক্টর তৈরি করে। অর্থাৎ ঘর কোন দিকে এবং কত দূরে আছে, সেই ধারণা ড্রোন নিজের মধ্যেই সংরক্ষণ করে। এরপর একটি ক্ষুদ্র নিউরাল নেটওয়ার্ক এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষিত হয়, যাতে ভবিষ্যতে শুধু আশপাশের দৃশ্য দেখেই ড্রোন ঘরের অবস্থান বুঝতে পারে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই নিউরাল নেটওয়ার্কের আকার মাত্র ৩.৪ কিলোবাইট থেকে ৪২ কিলোবাইট। অপরদিকে , আধুনিক মানচিত্রভিত্তিক রোবটিক সিস্টেমে শত শত মেগাবাইট মেমোরি প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ বি-নেভ প্রায় হাজার গুণ কম মেমোরি ব্যবহার করেও কার্যকর দিকনির্দেশনায় সক্ষম। শেখার পর্ব শেষ হলে ড্রোন দূরের কোনো এলাকায় কাজ করতে যেতে পারে। ফেরার সময় প্রথমে এটি পাথ ইন্টিগ্রেশন পদ্ধতিতে নিজের চলার হিসাব ধরে সরাসরি ঘরের দিকে এগোয়। কিন্তু দীর্ঘ যাত্রায় হিসাবে ছোট খাটো ভুল তথ্যও জমা হতে পারে। তখন বি-নেভ দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু করে। ড্রোন চারপাশের দৃশ্য চিনে নিউরাল নেটওয়ার্কের সাহায্যে নিজের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করে এবং ধাপে ধাপে ঠিক জায়গায় ফিরে আসে।

বাস্তব পরীক্ষায় এই প্রযুক্তি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। গবেষকদের ছোট ড্রোনটি ৩০ থেকে ১১০ মিটার দূরের পরীক্ষামূলক উড়ানে শতকরা শতভাগ ক্ষেত্রেই সফলভাবে ঘরে ফিরেছে। এমনকি প্রবল বাতাসের মধ্যেও ২০০ থেকে ৬০০ মিটার দূরত্বের দীর্ঘ উড়ানে প্রায় ৭০ শতাংশ সফলতা পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে ড্রোন প্রায় সোজা পথে কয়েকশ মিটার দূর থেকে ফিরে এসেছে।

গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র ও সস্তা ড্রোন ব্যবহারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চলেছে। কৃষিজমি পর্যবেক্ষণ, গুদাম ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় অনুসন্ধান, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কিংবা উদ্ধার অভিযানের মতো কাজে হালকা ও শক্তি-সাশ্রয়ী রোবটের ঝাঁক ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। তাঁরা মনে করেন, বি-নেভ শুধু রোবটিক্সেই নয়, জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। মৌমাছির মতো ক্ষুদ্র প্রাণীরা কীভাবে পরিবেশের দৃশ্য মনে রাখে এবং নিজের অবস্থান নির্ণয় করে বি-নেভ তার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে রোবট হয়তো মানুষের মতো বিভিন্ন জায়গার মানসিক মানচিত্র তৈরি করেও চলাফেরা করতে পারবে।

 

সূত্র: https://doi.org/10.4121/a0217a20-0443-48b2-8a04-9609ac267029.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × two =