বিজ্ঞান আজ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। তার ফলে একজন গবেষকের পক্ষে সবকিছু অনুসরণ করে এত বিপুল তথ্যের ভিড়ে নতুন ধারণা খুঁজে বের করা এখন বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের গবেষণাক্ষেত্রের খবর রাখাই যেখানে কঠিন, সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো শাখার সঙ্গে নতুন করে সংযোগ আবিষ্কার করা আরও কঠিন। এই সমস্যার সমাধানের জন্য এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ব্যবহার করার নতুন পথ দেখিয়েছেন জার্মানির কার্লসরুহে ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণার মূল বক্তব্য হল, বৃহৎ ভাষাভিত্তিক এআই মডেল বা এল এল এম ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় গবেষণার বিষয় খুঁজে বের করতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করতে পারে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন পাস্কাল ফ্রেডরিখ। তিনি মনে করেন, অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীরা সাধারণত নিজেদের পরিচিত ক্ষেত্রের মধ্যে বিভিন্ন ধারণার সম্পর্ক বুঝতে পারেন, কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন বা অপরিচিত বিষয়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা মানুষের জন্য অনেক কঠিন। তাই তিনি ধারণা করেন, মেশিন লার্নিং এমন কিছু নতুন বিষয় বা ধারণার সমন্বয় খুঁজে দিতে পারে, যা মানুষের কল্পনাতেও আসবে না।
এই ধারণা যাচাই করতে গবেষকরা ওপেন-সোর্স LLM LLaMa-2-13B ব্যবহার করেন। তাঁরা উপাদানবিজ্ঞান বা মেটেরিয়ালস সায়েন্সের ২ লাখ ২১ হাজার গবেষণাপত্রের সারসংক্ষেপ বিশ্লেষণ করেন। এআই মডেলটি এসব লেখার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ, রাসায়নিক সূত্র এবং বৈজ্ঞানিক ধারণা শনাক্ত করে। পরে মানুষের হাতে চিহ্নিত ডেটা দিয়ে মডেলটিকে আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোর ওপর বেশি মনোযোগ দেয়।
এই বিশ্লেষণে প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার রাসায়নিক সূত্র এবং ৩৬ লাখ বৈজ্ঞানিক ধারণা শনাক্ত করা হয়। পরে পুনরাবৃত্তিগুলো বাদ দিলে প্রায় ৫২ হাজার আলাদা রাসায়নিক সূত্র এবং ১২ লাখের বেশি স্বতন্ত্র ধারণা পাওয়া যায়। এরপর গবেষকরা এসব ধারণাকে নিয়ে একটি বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, যেখানে প্রতিটি শব্দ বা ধারণা একটি নোড বা সমন্বয় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। পুরো নেটওয়ার্কে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজারটা নোড ছিল।
এরপর আরেকটি মেশিন লার্নিং মডেল ব্যবহার করে দেখা হয়, কোন কোন ধারণা একসঙ্গে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে পেরোভস্কাইট এবং সোলার সেল শব্দ দুটি যদি গবেষণাপত্রে একসঙ্গে বেশি দেখা যায়, তাহলে এআই ধরে নেয় যে এই দুটি বিষয়ের মধ্যে নতুন গবেষণার যোগসূত্রের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে এই সংযোগ বাড়ছে না কমছে, সেটিও বিশ্লেষণ করা হয়। কোনো দুটি ধারণার সম্পর্ক দ্রুত বাড়তে থাকলে সেটি ভবিষ্যতের নতুন গবেষণাক্ষেত্রের ইঙ্গিত দিতে পারে।
এই গবেষণায় এআই কিছু চমকপ্রদ সম্ভাব্য বিষয়ও প্রস্তাব করে, যেমন- গ্রাফিন অক্সাইড ও প্রচলিত সিরামিক, অথবা মাল্টিফেজ স্ট্রাকচার ও সিলেক্টিভ লেজার মেল্টিং-এর সমন্বয়। বিভিন্ন গবেষক পরে স্বীকার করেন যে এসব প্রস্তাবের কিছু কিছু সত্যিই নতুন ও সম্ভাবনাময়।
তবে গবেষকেরা আবারও স্পষ্ট করে বলেছেন, এই প্রযুক্তি কোনো আবিষ্কার তৈরির যন্ত্র নয়। এটি কখনোই মানুষের সৃজনশীলতাকে প্রতিস্থাপন করবে না, হয়তো নতুন কোনো ধারণা খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। ভবিষ্যতে এই ধরনের এআই হয়তো শুধু গবেষণার বিষয় নয়, বরং নিজেই নতুন বৈজ্ঞানিক অনুমান তৈরি, পরীক্ষা পরিকল্পনা এবং ফলাফল বিশ্লেষণেও সাহায্য করতে পারবে।
সূত্র: https://doi.org/10.6084/m9.figshare.29315819
