একাকিত্বই স্মৃতিভ্রংশ ঘটায়? 

একাকিত্বই স্মৃতিভ্রংশ ঘটায়? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ মে, ২০২৬

একাকিত্ব যে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে, সে কথা নতুন কিছু না। শুধু মানুষের মনেই নয়, শরীর এবং সামাজিক জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে -এমন প্রমাণ বহুবার মিলেছে। তবে সাম্প্রতিক এক ইউরোপীয় গবেষণা বাজার চলতি একখানা প্রশ্নের মোক্ষম উত্তর খুঁজে পেয়েছে। মানুষের মনে দীর্ঘকাল একটা ভয় ছিল – একাকিত্ব কি সত্যিই মানুষের স্মৃতিশক্তিকে দ্রুত ক্ষইয়ে দেয়? এখানেই গবেষকরা স্পষ্ট বলছেন – না, অন্তত সরাসরি নয়।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এই গবেষণার বিবরণটি এজিং অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এতে ইউরোপের ১২টি দেশের ১০ হাজারেরও বেশি প্রবীণ মানুষের ওপর সাত বছর ধরে গবেষণা চালানো হয়। ফলাফল বলছে, যারা নিজেদের বেশি একা অনুভব করেন, তাদের স্মৃতিশক্তি শুরু থেকেই খানিকটা দুর্বল হতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্মৃতির অবনতি অন্যদের তুলনায় দ্রুত হয় না। গবেষণাটির মূল লক্ষ্য ছিল – একাকিত্ব কি সত্যিই মানুষের স্মৃতিশক্তির দ্রুত অবনতির জন্য দায়ী, নাকি এটি কেবল স্মৃতির প্রাথমিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে, সেটা জানা। গবেষকরা ৬৫ থেকে ৯৪ বছর বয়সী ১০,২১৭ জন মানুষের ওপর সাত বছর ধরে পর্যবেক্ষণ চালান। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যাঁরা বেশি একাকিত্ব অনুভব করতেন, তাঁরা শুরুতেই স্মৃতিশক্তির পরীক্ষায় তুলনামূলকভাবে কম নম্বর পান। অর্থাৎ, তাঁদের স্মরণশক্তি অন্যদের তুলনায় দুর্বল ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সময়ের সঙ্গে তাঁদের স্মৃতিশক্তি অন্যদের তুলনায় খুব দ্রুত খারাপ হয়নি। এরা সবাই ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও বার্ধক্যভিত্তিক জরিপ ‘SHARE’–এর অংশ ছিলেন। যাদের ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারের ইতিহাস ছিল, কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে গুরুতর শারীরিক সীমাবদ্ধতা ছিল, তাদের এই গবেষণার বাইরে রাখা হয়।

এই গবেষণায় স্মৃতিশক্তি যাচাই করতে অংশগ্রহণকারীদের তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত স্মরণশক্তির পরীক্ষা নেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, তাঁদের সামনে ১০টি শব্দ পড়ে শোনানো হতো এবং এক মিনিটের মধ্যে যত বেশি সম্ভব শব্দ মনে রাখতে বলা হতো। পাশাপাশি, একাকিত্বের মাত্রা নির্ধারণ করতে তিনটি প্রশ্ন করা হয়েছিল—তারা কি সঙ্গের অভাব অনুভব করেন? নিজেকে কি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়? এবং তারা কতটা একা বোধ করেন?

এ গবেষণায় একটি ভিন্ন গুরুতর সামাজিক চিত্র উঠে এসেছে। দেখা যায়, যাঁরা বেশি একাকী ছিলেন তাঁরা সাধারণত বয়স্ক, অধিকাংশ নারী এবং শারীরিকভাবে তুলনামূলকভাবে অসুস্থ। তাঁদের মধ্যে বিষণ্নতা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের হারও বেশি ছিল। দক্ষিণ ইউরোপীয় দেশগুলোতে একাকিত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। তবে সাত বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তাদের স্মৃতিশক্তির অবনতির হার অন্যদের তুলনায় বেশি নয়। অর্থাৎ, একাকিত্ব স্মৃতির ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু স্মৃতিকে দ্রুত ভেঙে পড়ার দিকে ঠেলে দেয় না। এই গবেষণাপত্রর প্রধান লেখক ড. লুইস কার্লোস ভেনেগাস-সানাব্রিয়া এই ফলাফলকে অপ্রত্যাশিত বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এতদিন ধারণা করা হতো একাকিত্ব সরাসরি ডিমেনশিয়া বা মানসিক অবনতির ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু নতুন তথ্য বলছে, একাকিত্ব হয়তো মস্তিষ্কের প্রাথমিক কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অবনতির গতিকে নয়। তবে গবেষকরা এটিও স্বীকার করেছেন যে, একাকিত্ব একটি পরিবর্তনশীল অনুভূতি। মানুষের জীবন, পরিবেশ ও সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একাকিত্বও বদলাতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

এই ফলাফল প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে হয়তো নতুন দিশা দেখাবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে একাকিত্ব শনাক্ত করার বিষয়টিও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ একাকিত্ব সরাসরি ডিমেনশিয়ার কারণ না হলেও এটি মানুষের মানসিক সক্ষমতা ও জীবনের গুণগত মানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

মানুষ শুধু শারীরিক সংযোগে নয়, মানসিক সম্পর্কেও বেঁচে থাকে। সামাজিক বন্ধন, আন্তরিক সম্পর্ক এবং মানসিক সাহচর্য প্রবীণ জীবনের সুস্থতার জন্য ঠিক ততটাই জরুরি, যতটা ওষুধ বা চিকিৎসা।

 

সূত্র: Memory trajectories in lonely individuals in Europe: an analysis of the Survey of Health, Aging, and Retirement in Europe (SHARE) by Luis Carlos Venegas-Sanabria, Eliana Pineda-Mateus, published in Aging, 2026; 1 DOI: 10.1080/13607863.2026.2624569

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one + nine =