ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইয়েলাপ্রগাদা সুব্বারাও

ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইয়েলাপ্রগাদা সুব্বারাও

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৯ মে, ২০২৬

বিজ্ঞান ইতিহাসে অনেক নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। আবার এমন কিছু মানুষও আছেন, যাঁদের অবদান কোটি কোটি মানুষের জীবন বদলে দিলেও তাঁরা রয়ে গিয়েছেন প্রায় বিস্মৃত। তেমনই এক বিজ্ঞানী ছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইয়েলাপ্রগাদা সুব্বারাও (১৮৯৫-১৯৪৮)। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পিছনে এনার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকলেও, তাঁর নাম আজ খুব বেশি মানুষ জানেন না। ১৮৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশের ভীমাভরমে জন্ম হয় সুব্বারাওয়ের। ছোটবেলাতেই জীবনে নেমে আসে একের পর এক আঘাত। তাঁর বাবা বেরিবেরি রোগে মারা যান। পরে দুই ভাইও মারা যান ট্রপিক্যাল স্প্রু রোগে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। কিন্তু তাঁর মা ভেঙ্কাম্মা নিজের গয়না বিক্রি করে ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করেন। ছাত্রজীবনে সুব্বারাও ছিলেন কিছুটা বিদ্রোহী স্বভাবের। পরে তিনি মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে খাদি পোশাক পরার কারণে তাঁকে পূর্ণ এমবিবিএস ডিগ্রি দেওয়া হয়নি। বদলে দেওয়া হয় এলএমএস ডিগ্রি। ফলে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় কাজের সুযোগও হারান তিনি। বাধ্য হয়ে তিনি আয়ুর্বেদ কলেজে অ্যানাটমি পড়াতে শুরু করেন। সেখানেই ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় চিকিৎসা ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে শুরু করেন। পরে অল্প টাকা আর বড় স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকায় পাড়ি দেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব রসায়নে গবেষণা শুরু করেন। সেখানে বিজ্ঞানী সাইরাস ফিসকে-এর সঙ্গে কাজ করে তিনি শরীরের ফসফরাস মাপার একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করেন, যা “ফিসকে-সুব্বারাও পদ্ধতি” নামে পরিচিত। এই গবেষণার পথ ধরেই সামনে আসে ফসফোক্রিয়েটিন এবং অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট বা এটিপি। যা জীবদেহে শক্তি উৎপাদনের মূল উপাদান হিসেবে পরিচিত। এই আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানকে নতুন দিশা দিলেও, হার্ভার্ডে সুব্বারাও উপযুক্ত স্বীকৃতি পাননি। পরে তিনি যোগ দেন লেডারলি ল্যাবরেটরিজে। সেখানেই তাঁর গবেষণা বিশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় পরিবর্তন আনে। তাঁর নেতৃত্বে আবিষ্কৃত হয় ক্লোরটেট্রাসাইক্লিন বা ‘অরিওমাইসিন’, যা কিনা বিশ্বের প্রথম টেট্রাসাইক্লিন গোত্রের অ্যান্টিবায়োটিক। তিনি ফলিক অ্যাসিড সংশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁর গবেষণা থেকেই পরে তৈরি হয় মেথোট্রেক্সেট, যা আজও ক্যানসারের চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ। এছাড়া তিনি ডাই-ইথাইলকার্বামাজিন বা ডিইসি তৈরিতে ভূমিকা পালন করেন, যা ফাইলেরিয়া রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর ওষুধ হিসেবে পরিচিত। শিশুদের লিউকেমিয়ার চিকিৎসার পথও তাঁর গবেষণায় খুলে যায়। ভিটামিন নিয়ে গবেষণাতেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। অবিশ্বাস্য সাফল্য সত্ত্বেও সুব্বারাও কখনও প্রচারের আলোয় আসেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সেবা করাই জীবনের আসল উদ্দেশ্য। জীবনের এক সময় তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং যোগ ও অদ্বৈত দর্শনের চর্চা করেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ৯ আগস্ট নিউ ইয়র্কে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু ইয়েলাপ্রগাদা সুব্বারাও-র আবিষ্কৃত ওষুধ আজও কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে। তাঁর অবদানকে সম্মান জানিয়ে ১৯৯৫ সালে ভারত সরকার তাঁর জন্মশতবর্ষে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। তবু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অসাধারণ ভারতীয় বিজ্ঞানীর নাম আজও যথেষ্ট পরিচিত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × two =