মানুষের ঘুম : কম কিন্তু গভীর

মানুষের ঘুম : কম কিন্তু গভীর

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৩০ মে, ২০২৬

মানুষের জীবনে ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ভালো ঘুম না হলে শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কাজকর্ম করার শক্তি পাওয়া যায় না এবং সব কিছুতেই এলিয়ে পড়ার একটা প্রবণতা তৈরি। কিন্তু একটি প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের মনে রয়েই গেছে। যদি ঘুম এতই দরকারি হয়, তাহলে মানুষ অন্য অনেক প্রাণীর তুলনায় এত কম ঘুমায় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈজ্ঞানিক নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড আর. স্যামসন তাঁর নতুন বই ‘দ্য স্লিপলেস এপ’-এ মানুষের ঘুমের বিবর্তনের ধারাপাত তুলে ধরেছেন।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ ঘুমের গুরুত্ব ভালোই বুঝত। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল মনে করতেন, ঘুম হলো শরীর ও আত্মার পুনরুদ্ধারের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাঁর মতে, ঘুম মানুষের শক্তি ফিরিয়ে আনে এবং মনকে বিশ্রাম দেয়, শান্ত করে। কিন্তু পরে ইউরোপের জ্ঞানদীপ্তির যুগে অনেক দার্শনিক এই ধারণার বিরোধিতা করেন। জন লক এবং ডেভিড হিউম মনে করতেন, ঘুম মানুষের যুক্তিবোধ ও জ্ঞানচর্চার পথে বাধা সৃষ্টি করে। তাঁদের দৃষ্টিতে ঘুম ছিল এক ধরনের সময়ের অপচয়।

তবে আধুনিক বিজ্ঞান অ্যারিস্টটলের ধারণাকেই অনেকাংশে সমর্থন করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম মানুষের স্মৃতিশক্তি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, বিপাকক্রিয়া এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক জমে থাকা বিপাকীয় বর্জ্য পরিষ্কার করে, অপ্রয়োজনীয় স্নায়বিক সংযোগ ছেঁটে ফেলে এবং চিন্তাভাবনাকে আরও কার্যকর করে তোলে। অর্থাৎ, ঘুম বিশ্রামের পাশাপাশি মস্তিষ্ক ও শরীরের রক্ষণাবেক্ষণের একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া।

ডেভিড স্যামসন লক্ষ্য করেন, মানুষের শরীরের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী আমাদের প্রতিদিন প্রায় সাড়ে নয় ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বের যেকোনো মানুষ গড়ে সাত ঘণ্টারও কম ঘুমায়। অর্থাৎ, মানুষের ঘুমে প্রায় আড়াই ঘণ্টার একটি ঘাটতি রয়েছে। স্যামসন এই ঘটনাকেই মানব ঘুমের বৈপরীত্য নামে অভিহিত করেছেন। কেন এমন হলো? স্যামসনের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানব বিবর্তনের ইতিহাসে। বহু লক্ষ বছর আগে মানুষের পূর্বপুরুষরা গাছের ডালে ঘুমাতো। পরে তারা ধীরে ধীরে মাটিতে থাকতে শুরু করে। কিন্তু মাটিতে ঘুমানো ছিল অনেক বেশি বিপজ্জনক, কারণ সেখানে শিকারি প্রাণীর আক্রমণের ঝুঁকি ছিল। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় গভীর ঘুমে থাকা নিরাপদ ছিল না। ফলে প্রাকৃতিক নির্বাচন এমন এক ধরনের ঘুমকে সমর্থন করে, যার সময়কাল ছোট কিন্তু অনেক বেশি কার্যকর।

স্যামসনের “স্লিপ ইন্টেন্সিটি হাইপোথেসিস” অনুযায়ী, মানুষের পূর্বপুরুষদের কম সময়ের মধ্যে বেশি গভীরভাবে ঘুমানোর ক্ষমতা ছিল। বিশেষ করে দ্রুত চোখের নড়াচড়াসম্পন্ন REM sleep, যাতে স্বপ্নময় ঘুমের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এই ধরনের ঘুম স্মৃতি সংরক্ষণ ও মানসিক পুনর্গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, মানুষ কম সময় ঘুমালেও সেই ঘুমকে আরও কার্যকর করে তুলেছিল।

এর ফলে আরেকটি সুবিধাও হয়েছিল। কম ঘুম মানে দিনের বেলায় বেশি সময় জেগে থাকা। এতে মানুষ শিকার, খাদ্য সংগ্রহ, সামাজিক সম্পর্ক তৈরি এবং নতুন প্রযুক্তি বা সরঞ্জাম ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত সময় পায়। ফলে কম কিন্তু কার্যকর ঘুম মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক বিকাশেও ভূমিকা রাখে।

স্যামসন তাঁর তত্ত্বের সমর্থনে বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক ও প্রাণীবৈজ্ঞানিক গবেষণার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি উগান্ডার টরোসেম্লিকি ওয়াইল্ড লাইফ রিসার্ভ অঞ্চলে বন্য শিম্পাঞ্জিদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি দেখেন, শিম্পাঞ্জিরা প্রতিরাতে গাছের ডাল, পাতা ও লতা দিয়ে বিশেষ ধরনের বাসা তৈরি করে ঘুমায়। এই বাসাগুলো তাদের স্থিতিশীলতা, উষ্ণতা এবং শিকারিদের হাত থেকে কিছুটা নিরাপত্তা দেয়।

শুধু শিম্পাঞ্জিই নয়, ওরাংওটাং, গরিলা ও বনোবোসহ অন্যান্য বৃহৎ বনমানুষও একইভাবে বাসা তৈরি করে। স্যামসনের মতে, এই বাসা নির্মাণের অভ্যাস ছিল মানব বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ এটি নিরাপদ ও আরামদায়ক ঘুম নিশ্চিত করেছিল, যা পরে মানুষের আশ্রয় নির্মাণের প্রবণতার ভিত্তি তৈরি করে।

তিনি আরও মনে করেন, নিরাপদ ঘুমের পরিবেশ মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাসা বানানোর মতো জটিল আচরণ হাতের দক্ষতা, পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিগত চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটায়। এ কারণেই কিছু গবেষক বাসা নির্মাণকে উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার দোলাচল বলে অভিহিত করেছেন।

তবে বইটির একটি ছোট সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে “aye-aye” নামের মাদাগাস্কারের এক অদ্ভুত নিশাচর লেমুরের কথা প্রায় নেই বললেই চলে। এই প্রাণীগুলিও নিজেরা বাসা তৈরি করে এবং তাদের শরীরের তুলনায় মস্তিষ্কের আকার অনেক বড়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এদের ঘুমের ধরন নিয়ে গবেষণা করলে বাসা নির্মাণ, ঘুম এবং বুদ্ধিমত্তার মধ্যে সম্পর্ক আরও ভালোভাবে বোঝা যেতে পারে।

‘দ্য স্লিপলেস এপ’ বই থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হল ঘুম কোনো অলসতার চিহ্ন নয়। বরং এটি মানুষের বিবর্তন, বুদ্ধিমত্তা এবং সামাজিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষ কম ঘুমালেও সেই ঘুমকে কার্যকর করে তোলার জন্য আমাদের শরীর ও মস্তিষ্ক দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছে। তাই আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও ভালো ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ সুস্থ শরীর ও সচল মস্তিষ্কের জন্য ঘুমের বিকল্প নেই।

 

সূত্র: doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-01478-9

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × one =