একটি বলেই আবদ্ধ কণাজগৎ 

একটি বলেই আবদ্ধ কণাজগৎ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২ জুন, ২০২৬

মহাবিশ্বের মৌলিক গঠন ও ভরের উৎস নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে আবারও নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করেছেন বিজ্ঞানীরা। আন্তর্জাতিক এক গবেষক দল এই প্রথম এমন একটি কণার পরীক্ষামূলক প্রমাণ পেয়েছেন, যা সম্পূর্ণভাবে কেবলমাত্র শক্তিশালী পারমাণবিক বলের মাধ্যমে আবদ্ধ থাকে। এই আবিষ্কার কণা পদার্থবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ধারণার পাশাপাশি , মহাবিশ্বে ভর কীভাবে সৃষ্টি হয়, সেই প্রশ্নের দিকেও আলোকপাত করেছে।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছে জাপানের ন্যাশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টাল এজেন্সি RIKEN। বিজ্ঞানীরা একটি ইটা প্রাইম (η′) মেসন কণা-কে কার্বন-১১ নিউক্লিয়াসের সঙ্গে অল্প ক্ষণের জন্য আবদ্ধ করতে সক্ষম হন। এর বিশেষত্ব হলো, এই বন্ধনে কোনো তড়িৎচুম্বকীয় বল অংশ নেয়নি। কারণ এই ইটা প্রাইম মেসন কণা বৈদ্যুতিকভাবে চার্জ হীন। ফলে পুরো ব্যবস্থাটি কেবল শক্তিশালী বলের মাধ্যমেই স্থিতিশীল ছিল। পদার্থবিজ্ঞানে এটিই প্রথম এমন উদাহরণ, যেখানে কোনো কণাকে শুধুমাত্র একটি মৌলিক বল দ্বারা আবদ্ধ অবস্থায় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

এই অবস্থা তৈরি করতে গবেষকরা উচ্চ-শক্তির প্রোটন বিম কার্বন-১২ নিউক্লিয়াসে আঘাত করেন। সংঘর্ষের ফলে একটি নিউট্রন বেরিয়ে যায় এবং একটি উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন কার্বন-১১ নিউক্লিয়াস তৈরি হয়। কিছু বিরল ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত শক্তি থেকে ইটা প্রাইম মেসন উৎপন্ন হয় এবং তা মুহূর্তের জন্য নিউক্লিয়াসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এই অবস্থা অবশ্য এক সেকেন্ডের অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের বেশি স্থায়ী হয়নি। কিন্তু তারই মধ্যে অত্যন্ত সংবেদনশীল WASA ডিটেক্টরের সাহায্যে জটিল তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হন।

এই গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইটা প্রাইম মেসনের অস্বাভাবিক ভরের নতুন ব্যাখ্যা। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী এই কণার ভর এত বেশি হওয়ার কথা নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর পেছনে কাজ করে কাইরাল প্রতিসাম্যে ভাঙন এবং গ্লুওন -এর জটিল কোয়ান্টাম আচরণ। গ্লুওন হলো সেই মৌলিক কণা, যা কোয়ার্কদের মধ্যে সবল বন্ধনে পরমাণুর কেন্দ্রকে একত্রে ধরে রাখে।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে ইটা প্রাইম মেসনের কার্যকর ভর প্রায় ৬০ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট (MeV) কমে যায়। এই পর্যবেক্ষণ ইঙ্গিত দেয় যে, ভর সৃষ্টি আসলে শূন্যস্থান-এর বৈশিষ্ট্য, যা শক্তিশালী আন্তঃসম্পর্কিত পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে মহাবিশ্বে দৃশ্যমান পদার্থের উৎপত্তি, পরমাণুর অভ্যন্তরীণ গঠন এবং মৌলিক বলসমূহের প্রকৃতি বোঝার জন্য নতুন দিশা দেখাবে।

 

সূত্র: Research published in Physical Review Letters; reported by Popular Mechanics (May 18, 2026).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × four =