সূর্য আসল রঙ কী? ছোটবেলার আঁকায়, আবহাওয়ার চিহ্নে, এমনকি কোনো জাতীয় পতাকাতেও সূর্যকে সাধারণত হলুদ রঙেই দেখানো হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও সূর্যকে “ইয়েলো ডোয়ার্ফ” বা হলুদ বামন নক্ষত্র বলে থাকেন। তবে শুনে অবাক লাগতে পারে, সূর্য আসলে হলুদ নয়, সাদা। মহাকাশ থেকে দেখা সূর্য একেবারেই সাদা। চাঁদে অবতরণ করা অ্যাপোলো অভিযানের নভোচারীরা কিংবা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মহাকাশচারীরা সূর্যকে সাদা বলেই বর্ণনা করেছেন। তাহলে পৃথিবী থেকে আমরা সূর্যকে হলুদ দেখি কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে। সূর্যের আলো আসলে একক কোনো রঙের নয়। এতে বেগুনি, নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা থেকে লাল-দৃশ্যমান আলোর পুরো বর্ণালীই থাকে। সব রঙের আলো একসঙ্গে মিশে আমাদের চোখে সাদা আলো হিসেবে ধরা পড়ে। তাই মহাকাশে, যেখানে বায়ুমণ্ডল নেই, সূর্যকে সাদা দেখায়। কিন্তু পৃথিবীতে পৌঁছানোর আগে সূর্যের আলোকে বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে আসতে হয়। এখানেই ঘটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যার নাম রেলি স্ক্যাটারিং। উনিশ শতকে ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জন উইলিয়াম স্ট্রাট বা লর্ড রেলি এই প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা দেন। বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন ও নাইট্রোজেনের ক্ষুদ্র অণুগুলো সূর্যের আলোকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। তবে সব রঙের আলো সমানভাবে ছড়ায় না। ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল ও বেগুনি আলো লাল বা কমলা আলোর তুলনায় অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলেই আকাশ নীল দেখায়। আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই, তখন আসলে সূর্যের সেই নীল আলোই দেখি, যা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে আমাদের চোখে পৌঁছেছে। মজার বিষয়, আকাশ বেগুনি হওয়ার কথা থাকলেও মানুষের চোখ নীল রঙের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, তাছাড়া বায়ুমণ্ডল কিছু বেগুনি আলো শোষণ করে নেয়। তাই আকাশ নীল দেখায়। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়া সূর্যের রঙও বদলে দেয়। সূর্যের মূল আলোর অনেকটা নীল অংশ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ায় আমাদের চোখে পৌঁছানো সরাসরি আলোতে তুলনায় বেশি থাকে হলুদ, কমলা ও লাল অংশ। ফলে সূর্যকে খানিকটা হলুদ মনে হয়।
তবে সূর্যের এই হলুদ রঙও সবসময় এক রকম নয়। দুপুরবেলায়, যখন সূর্য মাথার ঠিক ওপরে, তখন আলোকে বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে কম পথ অতিক্রম করতে হয়। ফলে আলো খুব বেশি ছড়ায় না এবং সূর্য প্রায় সাদা দেখায়। অন্যদিকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সূর্যের আলোকে বায়ুমণ্ডলের অনেক বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়। তখন নীল, সবুজ এমনকি হলুদের বড় অংশও ছড়িয়ে যায়। ফলে আমাদের চোখে পৌঁছায় মূলত লাল ও কমলা রঙের আলো। তাই সূর্যাস্তের আকাশ রক্তিম হয়ে ওঠে। অর্থাৎ নীল আকাশ আর লাল সূর্যাস্ত- দুটিই পদার্থবিজ্ঞানের একই সূত্রের ফল। এক ক্ষেত্রে আমরা ছড়িয়ে পড়া নীল আলো দেখি, অন্য ক্ষেত্রে দেখি সেই আলো হারিয়ে যাওয়ার পর বাকি থাকা লাল-কমলা অংশ। মহাকাশ থেকে তোলা ছবিগুলো এই সত্য আরও স্পষ্ট করে। চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে কিংবা মহাকাশযান থেকে তোলা ছবিতে কালো আকাশের পটভূমিতে সূর্যকে সাদা চাকতির মতো দেখা যায়। কারণ সেখানে বায়ুমণ্ডল নেই, ফলে আলো ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও নেই। তাই সূর্য আসলে রঙ বদলায় না; বদলে যায় আমাদের দেখার পরিবেশ। সূর্য সবসময়ই সাদা আলো ছড়ায়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সেই আলোর ওপর একটি সূক্ষ্ম সম্পাদনা করে। নীল অংশকে আকাশে ছড়িয়ে দেয়, আর সূর্যকে খানিকটা হলুদ দেখায়। এক অর্থে, নীল আকাশ আর হলুদ সূর্য একই গল্পের দুই দিক। আকাশের নীল রঙই সূর্যের হলুদ দেখানোর কারণ। প্রকৃতি একই পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম দিয়ে আমাদের সামনে দুটি ভিন্ন দৃশ্য তৈরি করে। একদিকে নীল আকাশ, অন্যদিকে সোনালি সূর্য।
সূত্র: space daily ; May ; 2026
