ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর একটি হল মহেঞ্জোদারো। ‘মহেঞ্জোদারো’ নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজার হাজার বছর আগের এক বিস্ময়কর উন্নত সুপরিকল্পিত নগরসভ্যতার ছবি। এই প্রাচীন সভ্যতার দরজা প্রথম খুলে দিয়েছিলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বাঙালি প্রত্নতাত্ত্বিকের অসাধারণ মেধা ও অধ্যবসায় ভারতের ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের ধারণাই বদলে দিয়েছিল। অথচ জীবদ্দশায় তিনি পেয়েছিলেন অবহেলা, অপমান এবং বঞ্চনা; আর তাঁর আবিষ্কারের কৃতিত্ব চলে গিয়েছিল অন্যের ঝুলিতে। রাখালদাস মহেঞ্জোদারোর প্রকৃত আবিষ্কারক হয়েও দীর্ঘদিন ইতিহাসের আড়ালে থেকে গেছেন।
১৮৮৫ সালের ১২ এপ্রিল মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে তাঁর জন্ম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯১১ সালে তিনি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (ASI)-এ যোগ দেন। মেধা, পরিশ্রম এবং অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার জোরে দ্রুতই তিনি প্রতিষ্ঠানের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন। ১৯১৭ সালে তাঁকে পশ্চিমাঞ্চলীয় সার্কেলের সুপারিন্টেন্ডিং আর্কিওলজিস্ট হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তখনকার পশ্চিমাঞ্চলীয় সার্কেলের আওতায় ছিল অবিভক্ত ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তার মধ্যে ছিল বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু ও পাঞ্জাবের একটা বড় অংশ। এই এলাকাতেই হাজার হাজার বছর আগে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতা। তবে সে সময় কেউই জানত না, এই অঞ্চল একদিন বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন নগরসভ্যতার পরিচয় বহন করবে।
১৯১৮ সালে রাখালদাস সিন্ধু নদ অববাহিকায় ব্যাপক সমীক্ষা শুরু করেন। তখন আধুনিক মানচিত্র, স্যাটেলাইট ছবি বা বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি কিছুই ছিল না। বিশাল এলাকা ঘুরে ঘুরে তাঁকে তথ্য সংগ্রহ করতে হতো। এই কঠিন কাজের মধ্যেই ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা, যা পরবর্তীকালে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
১৯২১ সালে লারকানা জেলার ঘাইবি-ডারো নামের এক স্থানে তিনি একটি ধ্বংসস্তূপ পরীক্ষা করছিলেন। ভেঙে পড়া একটা জায়গার ভেতর তিনি কয়েকটি বড় মাটির পাত্র দেখতে পান। কৌতূহলবশত একটি পাত্রের ভেতরে হাত ঢোকাতেই তাঁর আঙুল কেটে যায়। আশপাশের লোকজন মনে করেছিলেন, হয়তো সাপে কামড়েছে। পাত্র ভেঙে দেখা গেল, সেখানে সাপ নেই, আছে বিশেষ ধরনের সমাধি-পাত্র, হাড়ের টুকরো, পুঁতি এবং চকমকি পাথরের ফলক। তারই খোঁচায় তাঁর হাত কেটে গিয়েছিল। এই আবিষ্কার রাখালদাসকে বুঝতে সাহায্য করে যে সিন্ধু অঞ্চলের ধ্বংসাবশেষগুলোর মধ্যে এক অজানা প্রাচীন কৃষ্টির চিহ্ন লুকিয়ে আছে। এর এক বছর পর, ১৯২২ সালের ডিসেম্বরে তিনি পৌঁছান মহেঞ্জোদারোতে। আজ আমরা মহেঞ্জোদারোকে সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রধান নগর হিসেবে জানি। কিন্তু এক শতাব্দী আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল একটি বৌদ্ধ স্তূপ। ওইসব অঞ্চলে প্রাচীন কালে বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল। ফলে অধিকাংশ প্রত্নতাত্ত্বিকের ধারণা ছিল, ধ্বংসস্তূপটি মূলত বৌদ্ধ যুগের নিদর্শন। এর আগে বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ডি. আর. ভান্ডারকরও স্থানটি পরিদর্শন করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এর বয়স মাত্র কয়েকশো বছর। সেই ভুল মূল্যায়নের কারণে দীর্ঘদিন কেউ মহেঞ্জোদারোর প্রকৃত গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। কিন্তু রাখালদাস লক্ষ্য করেন, এখানে পাওয়া চকমকি পাথরের ফলকগুলি ঘাইবি-ডারোতে পাওয়া ফলকের সঙ্গে মিলে যায়। পাশাপাশি তিনি এমন কিছু সিলমোহর ও প্রতীক খুঁজে পান, যেগুলি হরপ্পা থেকে উদ্ধার হওয়া নিদর্শনের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই সূত্র ধরেই তিনি বুঝতে পারেন, হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো একটাই বৃহৎ সভ্যতার অংশ। ১৯২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি মহেঞ্জোদারোয় প্রথম বৃহৎ আকারের উৎখনন পরিচালনা করেন। তাঁর রিপোর্টে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খননক্ষেত্রের উল্লেখ রয়েছে। এই কাজই পরবর্তীকালে সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কারের ভিত্তি তৈরি করে।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় শুরু হয় এখানেই। ১৯২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার জন মার্শাল, দ্য ইলাস্ট্রেটেড লন্ডন নিউজ-এ একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে ভারতীয় উপমহাদেশে এক অজানা প্রাচীন সভ্যতার আবিষ্কারের ঘোষণা করেন। তাতে বিশ্বজুড়ে সাড়া পড়ে যায়। ভারত যে মিশর বা সুমেরের সমসাময়িক এক উন্নত নগরসভ্যতার অধিকারী ছিল, তা সেই প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। কিন্তু সেই প্রবন্ধে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় বা হরপ্পার আবিষ্কারক দয়ারাম সাহনির নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। সমস্ত কৃতিত্ব চলে যায় মার্শাল সাহেবের ঝুলিতে।
এরপর রাখালদাসের জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তাঁর বিরুদ্ধে মূল্যবান প্রত্নবস্তু চুরির মিথ্যে অভিযোগ আনা হয়, অনেকের মতে এটি ছিল ষড়যন্ত্রমূলক। চাকরি হারাতে হয় তাঁকে। একই সময়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। কিন্তু নিজের আবিষ্কারের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ করার সুযোগ আর পাননি। ১৯৩০ সালের ২৩ মে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তাঁর হারিয়ে যাওয়া উৎখনন-রিপোর্টটি উদ্ধার হয়। পরে সেটি প্রকাশিত হয় Mohenjo-Daro: A Forgotten Report নামে। তবে রহস্যজনকভাবে রিপোর্টের আসল উৎখনন-চিত্রগুলি আর কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেকের ধারণা, ইচ্ছাকৃতভাবেই সরিয়ে ফেলা হয়েছিল সেগুলি।
রাখালদাসের জীবদ্দশায় তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি না এলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস তাঁর প্রতি কিছুটা ন্যায়বিচার করেছে। আজ মহেঞ্জোদারোয় পাকিস্তান সরকারের স্থাপিত স্মারকফলকে তাঁর নাম উল্লিখিত। আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদরাও স্বীকার করেন, মহেঞ্জোদারোর প্রকৃত গুরুত্ব প্রথম যিনি উপলব্ধি করেছিলেন, তিনি রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে তাঁর অবদান শুধু ওই একটি প্রাচীন নগর আবিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন এক সময়ে কাজ করেছিলেন, যখন আধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক তারিখ নির্ধারণ পদ্ধতি কিংবা পর্যাপ্ত গবেষণা-সুবিধা কিছুই ছিল না। তবু অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি এমন এক সভ্যতার দরজা খুলে দিয়েছিলেন, যা ভারতীয় ইতিহাসের ধারণাকেই বদলে দেয়। আজ মহেঞ্জোদারোর নাম বিশ্বজোড়া পরিচিত। অথচ মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ইতিহাসের হারানো অধ্যায়টি প্রথম তুলে এনেছিলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাঁর জীবনকাহিনী শুধু একটি আবিষ্কারের গল্প নয়; এ হল প্রতিভা, অবিচার এবং বিলম্বিত স্বীকৃতি পাওয়ার ইতিবৃত্ত। আমাদের মনে পড়ে যায় রাধানাথ শিকদারের কাহিনী। তিনিও বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের উচ্চতা দুরূহ গাণিতিক গণনার সাহায্যে নির্ণয় করেছিলেন। কিন্তু আজও তা বিশ্বের কাছে জর্জ এভারেস্টের নামে পরিচিত – যিনি ও বিষয়ে কিছুই করেননি। সে কাহিনীও আমরা কোনো একদিন বিবৃত করব।
সূত্র: The Daily Star; June ; 2026
