প্রিয় খাবার বাছার ফাইনম্যান কৌশল

প্রিয় খাবার বাছার ফাইনম্যান কৌশল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৮ জুন, ২০২৬

রেস্তোরাঁয় গিয়ে কি সবসময় নিজের প্রিয় খাবারই অর্ডার করা উচিত, নাকি মাঝে মাঝে নতুন কিছু চেষ্টা করাও ভালো? শুনতে সাধারণ প্রশ্ন মনে হলেও, এই দ্বিধা একসময় বিখ্যাত মার্কিন পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যানকে একটি গাণিতিক সমস্যার সামনে দাঁড় করায়। আর কয়েক দশক পরে বিজ্ঞানীরা দেখছেন, ফাইনম্যান যে সমাধান দিয়েছিলেন, সেটিই ছিল সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

ঘটনাটি ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকের। ক্যালিফোর্নিয়ার একটি থাই রেস্তোরাঁয় নিয়মিত যেতেন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান ও তাঁর বন্ধু রালফ লেইটন। একদিন লেইটন ভাবছিলেন, তিনি কি তাঁর প্রিয় খাবার ‘জিঞ্জার চিকেন’ অর্ডার করবেন, নাকি মেনু থেকে অন্য কোনো পদ চেখে দেখবেন। তখনই ফাইনম্যান কাগজে-কলমে হিসাব কষতে শুরু করেন এবং দাবি করেন, তিনি এই সমস্যার একটি গাণিতিক সমাধান বের করে ফেলেছেন। সম্প্রতি ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ফাইনম্যানের সেই পুরনো নোট বিশ্লেষণ করে দেখেন যে তাঁর ধারণা সত্যিই ছিল সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশল ।

ফাইনম্যানের প্রশ্নটি আসলে মানুষের জীবনের বহু সিদ্ধান্তের সঙ্গেই জড়িত। আমরা কি বর্তমানে পাওয়া সেরা বিকল্পটিকেই বেছে নেব, নাকি আরও ভালো কিছু পাওয়ার আশায় খোঁজ চালিয়ে যাব? বাড়ি কেনা, জীবনসঙ্গী নির্বাচন, চাকরি বেছে নেওয়া কিংবা গাড়ি পার্ক করার জায়গা খোঁজার ক্ষেত্রেও একই ধরনের দ্বিধা কাজ করে। তিনি সমস্যাটিকে ‘ডিসিশন থিয়োরি’ বা সিদ্ধান্ততত্ত্বের একটি প্রশ্নে রূপান্তরিত করেন। বিশ্লেষণ করা হয়, কোনো ব্যক্তি বিভিন্ন বিকল্পের মধ্যে কীভাবে সবচেয়ে লাভজনক সিদ্ধান্তটি নিতে পারে। বিশেষ করে এটি ‘স্টপিং প্রবলেম’ নামে পরিচিত এক ধরনের সমস্যার অন্তর্ভুক্ত, যেখানে সিদ্ধান্ত নিতে হয়- ‘এখনই থামা উচিত, নাকি আরও খোঁজ চালিয়ে যাওয়া উচিত’।

রালফ লেইটন, ফাইনম্যানের হাতে লেখা নোটগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন। তবে ফাইনম্যানের হাতের লেখা এতটাই দুর্বোধ্য যে বহু বছর সেগুলো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। পরে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানবিজ্ঞানী টম গ্রিফিথস এবং তাঁর সহকর্মী ব্রায়ান ক্রিশ্চিয়ান সেই নোটগুলোর সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার করেন। ২০২১ সালে তাঁরা আবার বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন। বিশ্লেষণের পর তাঁরা নিশ্চিত হন, ফাইনম্যান শুধু সমস্যার সঠিক সমাধানই দেননি, বরং আরও বিস্তৃত সংস্করণেরও সমাধান করেছিলেন। তাঁরা এরপর জানার চেষ্টা করলেন, সাধারণ মানুষ কি স্বাভাবিকভাবে ফাইনম্যানের কৌশলের কাছাকাছি কোনো উপায়ে সিদ্ধান্ত নেয়? এ জন্য তাঁরা একটি অনলাইন গেম তৈরি করেন, যাতে ২,৫২০ জন অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়, যেন তাঁরা এক থেকে চার সপ্তাহের জন্য একটি নতুন শহরে বেড়াতে গেছেন। প্রতিদিন রাতে তাদের একটি রেস্তোরাঁ বেছে নিতে হবে। প্রতিটি রেস্তোরাঁর মান ১ থেকে ১০০ নম্বর। লক্ষ্য ছিল সর্বোচ্চ মোট নম্বর অর্জন করা। ফলাফলে দেখা যায়, সফরের শুরুতে মানুষ নতুন রেস্তোরাঁ চেষ্টা করতে বেশি আগ্রহী ছিল। কিন্তু সফরের শেষ যত এগিয়ে এসেছে, তারা ঝুঁকি কম নিয়ে আগের ভালো বিকল্পগুলোকেই বেছে নিয়েছে। অর্থাৎ, তাদের আচরণ ফাইনম্যানের গাণিতিক সূত্রের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে গেছে। যদিও অংশগ্রহণকারীরা জটিল গাণিতিক হিসাব করেননি, তবুও তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনটি ছিল সেই সূত্রের খুব কাছাকাছি। তবে এই মডেল বাস্তব জীবনের সব দিক ব্যাখ্যা করতে পারে না। যেমন, এতে একঘেয়েমির বিষয়টি ধরা হয়নি। বাস্তবে মানুষ একই প্রিয় খাবার বারবার খেলেও মাঝেমধ্যে নতুন কিছু চেষ্টা করতে চায়। তবু ফাইনম্যান দেখিয়েছেন, নতুন কিছু খুঁজব, নাকি পরিচিত সেরাটিতেই ভরসা রাখব এরও একটি যুক্তিসঙ্গত সীমা আছে।

 

সূত্র: doi: https:// doi. org/ 10.1038/d41586-026-00821-4

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 5 =