কোষের যৌবন ফেরানো 

কোষের যৌবন ফেরানো 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৯ জুন, ২০২৬

মানবদেহের বার্ধক্য কি সত্যিই তারুণ্যে উল্টে দেওয়া সম্ভব? বহু প্রতীক্ষিত সেই অনুসন্ধান এবার এক নতুন মাইলফলকে পৌঁছেছে। এই প্রথম একজন মানুষের শরীরে এমন একটি জিন-ভিত্তিক থেরাপি প্রয়োগ করা হয়েছে, যার লক্ষ্য হলো বয়স্ক ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে আবার তরুণ কোষের মতো আচরণ করতে বাধ্য করা।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বায়োটেক প্রতিষ্ঠান লাইফ বায়োসায়েন্সেস ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এই অভিনব চিকিৎসা পদ্ধতির পরীক্ষা শুরু করেছে। এই প্রযুক্তিকে বলা হচ্ছে “পার্শিয়াল সেলুলার রি-প্রোগ্রামিং”। এর মূল ধারণা হলো- কোষকে সম্পূর্ণভাবে স্টেম সেলে পরিণত না করে, তার বয়সজনিত ক্ষয় ও দুর্বলতা আংশিকভাবে মুছে দিয়ে তাকে আরও তরুণ ও কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।

বর্তমান পরীক্ষাটি পরিচালিত হচ্ছে গ্লকোমা রোগীদের ওপর। গ্লকোমা এমন একটি চোখের রোগ, যা অপটিক নার্ভের ক্ষতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত অন্ধত্ব ডেকে আনতে পারে। অপটিক নার্ভ চোখের রেটিনা থেকে মস্তিষ্কে দৃশ্যসংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দেয়। একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই স্নায়ুকোষগুলো সাধারণত আর পুনরুজ্জীবিত হতে পারে না।

এই থেরাপিতে এমন তিনটি বিশেষ জিনকে সক্রিয় করা হয়, যেগুলো কোষের বার্ধক্য দূরীকরণে সাহায্য করে। গবেষকদের আশা, এসব জিন থেকে উৎপন্ন প্রোটিন ক্ষতিগ্রস্ত অপটিক নার্ভের নিউরনগুলোকে পুনর্জন্মের ক্ষমতা দিতে পারে এবং দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।

এই গবেষণার পেছনে রয়েছে ২০২০ সালে প্রকাশিত এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী গবেষণা। তখন হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের জিনতত্ত্ববিদ ডেভিড সিঙ্কলেয়ার এবং তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছিলেন যে, ইঁদুরের অপটিক নার্ভে এই তিনটি জিনকে সক্রিয় করলে ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ু পুনরায় বৃদ্ধি পায় এবং বয়সজনিত দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের প্রক্রিয়াও আংশিকভাবে উল্টে যায়। এরপর ইঁদুর ও বানরের ওপর আরও বহু পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে লাইফ বায়োসায়েন্সেস।

তবে বিজ্ঞানীরা সতর্কও করছেন। কারণ কোষের বয়স উল্টে দেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। কোষ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ক্যানসার কোষে পরিণত হতে পারে। এতদিন এ কারণেই এই প্রযুক্তিকে মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়নি। গবেষক মাত কেবার্লিন মনে করেন, প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা অসাধারণ হলেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিন্তু ভয়াবহ হতে পারে। তাই চোখকে প্রথম পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে, কারণ এখানে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে সীমিত।

যদি এই ট্রায়াল সফল হয়, তবে এটি শুধু গ্লুকোমার চিকিৎসাতেই নয়, বরং বার্ধক্যজনিত নানা রোগের চিকিৎসায় নতুন পথের দিশা দেবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তি মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র, পেশি এবং অন্যান্য অঙ্গের ক্ষয়প্রাপ্ত কোষ পুনরুজ্জীবিত করার পথও খুলে দিতে পারে। ফলে মানুষের আয়ু শুধু নয়, তার সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনকাল বাড়ানোর স্বপ্ন বাস্তবতার আরও কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

 

সূত্র: doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-01836-7

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight − three =