খাদ্যবর্জ্যজাত শক্তিশালী CO₂-শোষক দানা

খাদ্যবর্জ্যজাত শক্তিশালী CO₂-শোষক দানা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ জুন, ২০২৬

বিশ্ব উষ্ণায়নকে রুখতে হলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে সীমাবদ্ধ রাখবার জন্য শুধু গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমালেই হবে না; বায়ুমণ্ডলে ইতিমধ্যে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) অপসারণও জরুরি। এই লক্ষ্য পূরণে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে “ডাইরেক্ট এয়ার ক্যাপচার” (DAC) প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা করছেন। তবে বর্তমান DAC পদ্ধতিগুলো সাধারণত ব্যয়বহুল এবং প্রচুর শক্তি-নির্ভর। এই প্রেক্ষাপটে সুইজারল্যান্ডের ETH Zurich-এর গবেষকেরা এক অভিনব ও পরিবেশবান্ধব সমাধান উদ্ভাবন করেছেন, যা তৈরি হয়েছে দুগ্ধশিল্প ও টোফু উৎপাদনের বর্জ্য থেকে।

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা হুই (whey) এবং টোফু তৈরির সময় উৎপন্ন প্রোটিনসমৃদ্ধ তরল বর্জ্য থেকে প্রোটিন সংগ্রহ করেন। এরপর সেই প্রোটিনকে অ্যামাইলয়েড ফাইব্রিলে নামক বিশেষ ধরনের তন্তুযুক্ত গঠনে রূপান্তরিত করা হয়। পরে এই ফাইব্রিলকে পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইডের সঙ্গে মিশিয়ে আধ থেকে এক সেন্টিমিটার আকারের ছিদ্রযুক্ত পুতি বা দানায় পরিণত করা হয়। এইসব পুতি স্পঞ্জের মতো কাজ করে বাতাস থেকে CO₂ শোষণ করতে সক্ষম।

বাতাসের সংস্পর্শে এলে পুতির ভেতরের পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড কার্বন ডাই-অক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন কার্বোনেট নামক যৌগ তৈরি করে। এর ফলে বায়ুমণ্ডল থেকে CO₂ কার্যকরভাবে অপসারিত হয়। গবেষণার প্রধান লেখক ঝৌ ডং জানান, পরীক্ষাগারে মাত্র এক গ্রাম উপাদান ব্যবহার করে ৯৭ মিলিগ্রাম CO₂ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। এই দক্ষতা বর্তমান অনেক DAC প্রযুক্তির তুলনায় ১০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নতুন প্রযুক্তিতে CO₂ মুক্ত করার জন্য উচ্চ তাপমাত্রা বা শক্তিশালী ভ্যাকুয়ামের প্রয়োজন হয় না। গবেষকেরা ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় পুতিগুলোর ওপর পর্যায়ক্রমে মৃদু অ্যাসিড ও ক্ষার স্প্রে করে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে শোষিত CO₂ আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে শক্তির ব্যবহার কমে যায়।

আরও একটি বড় সুবিধা হলো, এই পুতিগুলো বারবার ব্যবহার করা যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, কার্বন শোষণ ও মুক্তির ৩০টি চক্রের পরও পুতিগুলোর কার্যকারিতা প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। গবেষকদের ধারণা, বাস্তবে এগুলো কয়েক হাজার চক্র পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। ব্যবহারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছালে পুতিগুলোকে কৃষিক্ষেত্রে সার হিসেবে ব্যবহার করা বা জৈব জ্বালানিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে, কারণ এগুলো সম্পূর্ণ জৈব ও জৈব পচনশীল।

গবেষক দল বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে এই প্রযুক্তি বিদ্যমান DAC ব্যবস্থার তুলনায় কম পরিবেশদূষণ সৃষ্টি করে। যদিও এখনো শিল্প পর্যায়ে এর কার্যকারিতা ও খরচ নির্ধারণ করা হয়নি, তবু গবেষকদের বিশ্বাস এটি সহজেই বড় পরিসরে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। খাদ্যশিল্পের বর্জ্যকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করে কম খরচে ও কম শক্তিতে বায়ুমণ্ডল থেকে CO₂ অপসারণের এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

 

সূত্র: ETH Zurich, june 11,2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 1 =