সমগ্র পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। একের পর এক উদ্ভিদ ও ছত্রাক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে, অথচ তাদের অনেককেই বিজ্ঞান এখনও পুরোপুরি চিনেই উঠতে পারেনি। এমন এক সময়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উদ্ভিদ ও ছত্রাক সংগ্রহশালা লন্ডনের কিউ রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস এক উদ্যোগের মাধ্যমে গবেষণা ও সংরক্ষণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিল।
কিউ গার্ডেনস প্রতিষ্ঠানটি তাদের সংগ্রহের ৭৪ লক্ষ উদ্ভিদ ও ছত্রাকের নমুনার ডিজিটাইজেশন সম্পন্ন করেছে। চার বছরব্যাপী এই প্রকল্পে প্রায় ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় হয়েছে এবং এতে কাজ করেছেন ১০০ জন কর্মী ও ৪২ জন স্বেচ্ছাসেবক।
ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে প্রতিটি নমুনার উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবি তোলা হয়েছে। শুধু শুকনো উদ্ভিদ বা ছত্রাকের নমুনাই নয়, তাদের সঙ্গে সংযুক্ত লেবেলগুলিও সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব লেবেলে নমুনা কোথায়, কখন এবং কার মাধ্যমে সংগৃহীত, সেসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। ফলে গবেষকরা এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনে এই তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন।
কিউ গার্ডেনসের বিজ্ঞানবিষয়ক নির্বাহী পরিচালক অ্যালেক্সান্দ্রে আন্তোনেল্লি মনে করেন, এই উদ্যোগ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে আরও উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক করে তুলবে। আগে যেসব গবেষকের লন্ডনে এসে নমুনা দেখতে হতো, এখন তারা নিজ দেশের গবেষণাগার থেকেই সেই তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন।
এই ডিজিটাল সংগ্রহ গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ইনফরমেশন ফ্যাসিলিটি (GBIF)-এর মাধ্যমেও অনুসন্ধান করা যাবে, যা বিশ্বের প্রাকৃতিক ইতিহাসসংক্রান্ত সংগ্রহগুলোর একটি আন্তর্জাতিক তথ্যভাণ্ডার।
ডিজিটাইজেশন প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার দিনই কিউ প্রকাশ করেছে “State of the World’s Plants and Fungi 2026” শীর্ষক প্রতিবেদন। সেখানে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার উদ্ভিদ ও ছত্রাকবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটাতে পারে।
কৃবু-র সাহায্যে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন প্রজাতি শনাক্ত করা, বিলুপ্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন করা এবং সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা আরও সহজ হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত করেছেন। তবে ধারণা করা হয়, আরও অন্তত ১ লাখ প্রজাতি এখনও আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পরিচিত উদ্ভিদগুলোর মধ্যে প্রায় ২৯,৭৪৮টি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এক হাজারেরও কম প্রজাতিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলেও প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত এর থেকে আরও অনেক বেশি।
ছত্রাকের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ছত্রাক প্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে, কিন্তু বিজ্ঞানীদের ধারণা, বাস্তবে এদের সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন হতে পারে। এই অজানা বৈচিত্র্যকে অনেক সময় জীববিজ্ঞানের “ডার্ক ম্যাটার” বলা হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন আবিষ্কৃত উদ্ভিদ ও ছত্রাকের অধিকাংশই বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে বিজ্ঞানীদের জন্য প্রজাতি শনাক্তকরণ বা ট্যাক্সোনমি এখন কার্যত বিলুপ্তির বিরুদ্ধে একটি দৌড়ে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনটি আরও একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেছে। ঔপনিবেশিক যুগে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সংগ্রহশালাগুলোতে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ নমুনা সংরক্ষিত থাকলেও এখন ক্রমশ সেই নমুনাগুলো তাদের নিজস্ব দেশ বা অঞ্চলে সংরক্ষিত হচ্ছে। এর ফলে বহুল জীববৈচিত্র্যসম্পন্ন দেশগুলো নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কে গবেষণা ও সংরক্ষণে আরও বড় ভূমিকা নিতে পারছে।
কিউ গার্ডেনসের এই বিশাল ডিজিটাইজেশন প্রকল্প একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য তো বটেই। পাশাপাশি এটি বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নতুন প্রজাতি আবিষ্কার এবং বিলুপ্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার ও কৃবুর সমন্বয় আগামী দশকে উদ্ভিদ ও ছত্রাকবিজ্ঞানের গবেষণাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
সূত্র: doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-01917-7
